মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল, ২০২১

আতঙ্ক

 


“আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিবি বইতে?”

“নাঃ, কোনও দরকার নেই। সব গুলিয়ে যাবে তাহলে,” আমি ঘাড় সোজা করে বাবা-কে বললাম। “এবারে ঢুকে পড়ছি। বেশিক্ষন বাইরে অপেক্ষা করলে টেনশন বেড়ে যায়।“

“ঠিক আছে চলে যা। একদম চিন্তা  করবি না। পরীক্ষা খুব ভালো হবে,” আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে বাবা আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল। আমি চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিলাম। পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা আজ। যেখানে সিট পড়েছে তার বাইরে পুরো মেলা বসে গেছে। বাবা-মায়েরা ডাব, দইয়ের ভাঁড় নিয়ে নিজের-নিজের ছেলেকে ঘিরে উদ্বিগ্ন চেহারায় দাঁড়িয়ে। গতবছরের প্রশ্নপত্র খুব কঠিন এসেছিল। এবারে কেমন হয় তা নিয়ে বিভিন্ন জটলায় জোর আলোচনা চলছে। দূরে বোধহয় ঋতুরাজ আর সোমদেব-কে দেখতে পেলাম। ওরাও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আমি আর সময় নষ্ট না করে তিন লাফে স্কুলের ভিতরে ঢুকে পড়লাম।

বিল্ডিঙয়ের গঠন, দেওয়ালের রঙ সবই একটু অদ্ভুত। সাধারণত স্কুলে যেমন হয়, তেমন নয়। রামধনুর যথেচ্ছ পোঁচ পড়েছে সর্বত্র। এর আগে বাংলা, ইংরাজি বা অন্যান্য বিষয়ের পরীক্ষা হয়ে গেছে। তখন এতোটা বৈচিত্র নজরে আসেনি। সিঁড়ির ধাপগুলোও যেন অত্যাধিক মসৃণ। পা পিছলে আছাড় খাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমি যথোপযুক্ত সাবধানতা অবলম্বন করে দোতলায়, এক্সাম রুমে চলে এলাম।

ক্লাসে তখনও কেউ নেই। আমার জন্যে নির্ধারিত আসন রয়েছে লাস্ট বেঞ্চের আগে। সেখানে ক্লিপবোর্ড, পেন্সিল-বক্স, রুলার ইত্যাদি রেখে গুছিয়ে মাথা নিচু করে বসলাম। মনোযোগ বাড়ানোর আদর্শ উপায়। কতক্ষণ ছিলাম জানি না, অকস্মাৎ সব কটা ছেলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। সবারই ভীষণ গম্ভীর মুখ। কেউ কারোর সাথে কথা বলছে না। ওয়ার্নিং বেল পড়তেই সিল্‌ড প্রশ্নপত্র বিলি হয়ে গেল। স্নায়ু চূড়ান্তভাবে উত্তেজিত।

ফাইনাল বেলে আরম্ভ হল পরীক্ষা। ও’দিকে কোশ্চেন পেপার খুলতেই আমার চোখ ছানাবড়া। কোথায় ফিজিক্স? এযে রসায়নের কঠিন-কঠিন প্রশ্নে ভর্তি। নিশ্চয়ই কোনও গণ্ডগোল হয়েছে। ভুল করে পরের দিনের পেপার আজ দিয়ে দিয়েছে। আমি হাসি মুখে পাশে দিপাঞ্জনের দিকে তাকালাম। আশা করেছিলাম ওরও হতবাক মুখশ্রী দেখব। কিন্তু না। ছেলেটা মুখ গুঁজে একমনে লিখেই চলেছে।

“এই, কেমিস্ট্রি পেপার কেন দিয়েছে?” আমি ফিসফিস করে বললাম ওকে।

“কী দেবে তাহলে?”

“ফিজিক্স!”

“ধুস্‌, ফিজিক্স পরীক্ষা তো দু’দিন পরে।“

“বলিস কী?” আমার চোখে জল চলে এল। খুব ইচ্ছে করল এক ছুটে বাইরে বাবার কাছে চলে যাই। একটা প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ, অসহায় ভাব উঠে এল পায়ের কাছ থেকে। কতবার সবার সঙ্গে রুটিন মিলিয়েছি। তাও এত বড় ভুল কীভাবে করলাম? কী করব এখন? দু’দুটো পেপার দিতে হবে। অথচ আমার মাথা একেবারে শূন্য। কেমিস্ট্রির একটা সংজ্ঞাও মনে পড়ছে না।

“কী ব্যাপার? এক্সাম শুরু হতে না হতেই কথা বলা শুরু করে দিয়েছ?” রুমের পরিদর্শক স্যার কড়া চাহুনি নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। “খাতা কেড়ে নেব নাকি?”

“স্যার ও আজ ফিজিক্স পড়ে এসেছে,” দিপাঞ্জন দাঁত বের করে বলল। ক্লাসের বাকি ছেলেগুলো ওর কথা শুনে একবার অবজ্ঞাভরে পিছনে তাকিয়ে নিজেদের কাজে মগ্ন হয়ে গেল।

“বটে। এমন বেয়াদব, বেয়াক্কেলে ছাত্রের সাথে এমনই হওয়া উচিত,” স্যার দাঁত কিড়মিড় করলেন। “স্কুলড্রেসও পরেনি, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। ছ্যাঃ!”

খেয়াল হল, সত্যি তো। একটা পাজামা আর গেঞ্জি গায়ে বসে আছি। কি ভয়ানক! কি ভয়ানক!

ঘেমে স্নান করে উঠে পড়লাম আমি। বুকের ভিতরে ধড়াস্‌-ধড়াস্‌ করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, বিছানায় ছেলে, মেয়ে, বউ নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। রাতবিরেতে শুধু আমার চোখে আর ঘুম এল না। অফিসে কাজের চাপ বাড়লেই এই নিঃসীম আতঙ্কের দুঃস্বপ্নটা দেখি। এর থেকে মুক্তির উপায় জানা নেই।।

বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২১

ট্রু লাব


 বসন্তবিলাপ, অর্থাৎ আমাদের সূর্য স্যারের বাংলা কোচিং থেকে বেরিয়েই অয়ন আমার হাত টেনে ধরল। বলল, “ওইদিকে দেখ। মোড়ের কাছে ঝিণ্টি দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আজকেই তোকে প্রপোজ করবে।“

ধড়াস করে উঠল আমার বুক। সত্যি, ঝিণ্টি ঠায় এ’দিকেই চেয়ে রয়েছে। স্যারের সাহিত্যালোচনার ফাঁকে চোরা দৃষ্টির আদানপ্রদান হচ্ছিল শুভবিজয়ার করমর্দনের পর থেকেই। আমি তখনও মিথিলা-কে নিয়ে আশাবাদী ছিলাম বলে পত্নীনিষ্ঠতার কাঠিন্য বজায় রাখতাম চেহারায়। তবে এতদিনে মোটামুটি নিশ্চিত যে সে’কুলে আমার ঠাঁই নাই। তাই আজ বোধহয় ফিক্‌ করে হেসেও ফেলেছিলাম চাউনির উত্তরে। তাতেই নির্ঘাত দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেলেছে।

“অন্য পথ দিয়ে বাড়ি ফিরলে হয় না?” আমি প্রস্তাব দিলাম।

“ছিঃ, বৌদি তোকে কাপুরুষ ভাববে। মরদের মতন বুক চিতিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়া। ভয় কিসের?”

“আহা, এখনই বৌদি বলার কী আছে? সবে পরশু বললাম ঝিণ্টি-কে আমার খারাপ লাগে না আর ওমনি তোর লম্ফঝম্ফ শুরু। মনে নেই, আদৃতা-র বেলায় হুড়োপাড়া করতে গিয়ে কেমন কেলেঙ্কারি হয়েছিল?”

“বস্‌, আসল ব্যাপারটা হল আত্মবিশ্বাস। ওরা সেটাই দেখতে চায়। চোখে চোখ রেখে একবার কথা বলে দেখ, পুরো দুনিয়া লাট্টু,” অয়ন বলল।

“ফাঁকা কলসির বাজনা বেশী। পাপিয়া তোকে ভাই পাতায়নি?”

“ওটা মিসহ্যাপ। সায়েন্সের মেয়েদের সঙ্গে কক্ষনও প্রেম করবি না। আবহাওয়াটাই বিষাক্ত সে’খানে। ঘাড় কাত করে নোট কপি করে দিতে বলে। কিন্তু দোকলা ফুচকা খাওয়ার প্ল্যান ফাঁদলেই রাখি দিয়ে ইনস্যুরেন্স করিয়ে রাখে। তারচে’ বাংলা বা ইংরিজি কোচিং ঢের ভালো। ক্লাসে ঢুকলেই মনে হয় বাতাসে বহিছে প্রেম…”

“অ্যাই, একটা কথা ছিল। শোন্‌ এ’দিকে…”

কথায় কথায় কখন মোড়ের মাথায় চলে এসেছি, খেয়ালই করিনি। থমকালাম ঝিণ্টির তীক্ষ্ণ ডাক শুনে। অস্বীকার করব না, হঠাৎ ভীষণ ঘাবড়ে পাশের বিশ্বনাথ হার্ডওয়ার্সে সিমেন্টের বস্তা গুনতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু কমলি ছোড়নে ওয়ালি নহি। আবার হাঁক ছাড়ল, “কিরে, শুনতে পাচ্ছিস না?”

“তোকে ডাকছে মনে হয়,” আমি অয়নের জামা টেনে বললাম। “তোর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।“

“তোর বউ আমায় ডাকবে কেন হতভাগা?” অয়ন খিঁচিয়ে উঠল। “মেয়েটা একটু লক্ষ্মী ট্যারা। তাই ভুল বুঝছিস। যা, দুগ্‌গা দুগ্‌গা বলে এগিয়ে যা। “

“হারামজাদা তোকে কতবার বলেছি ট্রু লাব নিয়ে বাওয়াল দিবি না। আগ বাড়িয়ে বৌদি বৌদি করলে যাবে সব ভেস্তে আবার। যত অলক্ষুনে ব্যাপার।”

অয়ন-কে গাল পেড়ে আমি ঝিণ্টির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর এত কাছাকাছি আগে কোনও দিন আসিনি। গলা শুকিয়ে গেল তাই। তবে টের পেলাম, অয়নের চোখে ন্যাবা আছে। মেয়েটা মোটেই লক্ষ্মী ট্যারা নয়। বরং এমন ডাগর আঁখিতে আমার পায়ের তলায় ভূমিকম্প হল। না না ভুল বললাম। আর্থ-কোয়েক হয়েছিল তিয়াসার বেলায়। আর কান দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়েছিল সৌমিতার হাসি দেখে। গুলিয়ে ফেললে চলবে না। এ’বারেরটা একেবারে আলাদা অনুভূতি। সাইকেল, অটো, রিকশার হর্নকেও গিটারের ঝঙ্কার মনে হচ্ছে। দু’সপ্তাহ পরে উচ্চমাধ্যমিক শুরু। নিকুচি করেছে তার। ঝিণ্টি তুই একবার বল, নেই তোর নেই, কেউ নেই…

“হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?” কর্কশ গলায় বলল সে। “স্যার-কে গিফ্‌ট দেব বলে আমরা সবাই মিলে চাঁদা তুলেছি। তুই আর অয়ন সেই কবে থেকে ঝোলাচ্ছিস। এখুনি দু’জনে দশ টাকা করে দিয়ে দে ডিম্পি-কে।“

আশাভঙ্গের ঝনঝন আওয়াজ চেপে ঢোঁক গিলে বললাম, “ডিম্পি কে?”

“সেকিরে! তুই আমার নামও জানিস না?” ঝিণ্টির কাঁধের পিছন থেকে আরেকটা চাঁদপনা মুখ অক্ষিপুট পিটপিটিয়ে জানতে চাইল।

এক লাফে অয়নের কাছে ফিরে বললাম, “শিগগির কুড়ি টাকা বের কর।“

“বৌ… থুরি ঝিণ্টি কী বলল?”

“চুপ্‌ শালা। দেব তোর গলাটা টিপে,” আমি ক্ষেপে গিয়ে ওর কলার ধরতে যাচ্ছিলাম। তারপরে মাথা ঠাণ্ডা করে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, ডিম্পি, মানে ওই ক্যাশিয়ার মেয়েটাকে চিনিস?”

“বুধবার সন্ধ্যের ব্যাচ। কেন? ওও…ও! জিও গুরু! বৌদিকে দারুণ মানাবে কিন্তু তোর সাথে…।।“