সোমবার, ২৪ মে, ২০২১

যন্ত্র

‘বুদ্ধিবীজী’ যন্ত্রের সার্কিট পুড়ে ধোঁয়া বেরোতে দেখে তড়িঘড়ি কন্ট্রোল প্যানেলের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। । প্রথম প্রচেষ্টাতেই সাফল্যের আশা করা অর্বাচীনতার সামিল। তাও হা-হুতাশ করতে গিয়ে খেয়ালই করিনি কখন আমার পরীক্ষা নিরীক্ষার সাবজেক্ট টিরগিটি, তার লম্বা লেজ খাড়া করে চেয়ারে উঠে বসেছে। সে’খান থেকেই গুরুজনদের মত জিজ্ঞাসা করল, “রাতে ঘুমাও না কেন?”

গবেষণায় মজে থাকলে আমার চেতনা ধোঁয়াশায় স্লথ হয়ে যায়। টিরগিটির প্রশ্ন শুনে স্বভাবতই প্রথমে ঘড়ি দেখলাম। আড়াইটে বাজে। তারপরে অবাক হয়ে ওর দিকে চাইলাম। সে ততক্ষণে লম্বা জিভ দিয়ে একটা উড়ন্ত আরশোলা টেনে নিয়ে ডিনার সারছে। কি আভিজাত্যপূর্ণ সেই চর্বন। দেখলেই ভক্তি আসে। কথা বলিয়ে টিরগিটি, মানে আমার প্রয়াস সাকসেসফুল। তবে ওর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত। ইতস্তত করে বললাম, “অনেক কাজ ভায়া। ঘুমুলেই সময় নষ্ট।“

“ওই করে ইতিমধ্যেই ব্রেনে একগাদা বিটা-অ্যামাইলয়েড জমা করেছ। ডিমেনশিয়া ধরল বলে,” টিরগিটি ভাবলেশহীন হয়ে বলল। নিজের হাতে টিকটিকি আর গিরগিটির সংমিশ্রণে একে বানিয়েছিলাম। আর, এখন তার বেজায় দেমাক। কিন্তু সে’সব ভাবার সময় কোথায় আমার। মনুষ্যেতর প্রাণীর মধ্যে বুদ্ধির বীজ বপন করতে সক্ষম হয়েছি। আনন্দে উদ্বাহু নৃত্য করতে ইচ্ছে করছে। কোনও মতে বললাম, “ও’সব ওষুধে সেরে যাবে।“

“ইকনমিক জাস্টিফিকেশনটা কী হে?’ টিরগিটি বিরক্ত হয়ে বলল। “অকারণে ফার্মা কোম্পানিগুলোকে বড়লোক করবে। তারচে’ গভীর ঘুম দিলে মগজের গ্লিম্‌ফ্যাটিক সিস্টেমটা ফ্রি-তেই ঝাড়পোঁছ করে দেবে আবর্জনা।“

আমি ততক্ষণে গড় হয়ে ‘বুদ্ধিবীজী’ মেশিনটাকে প্রণাম করছি। এর ব্যবসায়িক সাফল্য নিশ্চিতরূপেই আকাশচুম্বী হতে চলেছে। টিরগিটি যে নিমেষের মধ্যে এমন সর্ববোদ্ধা হয়ে যাবে তা আমি আশাই করিনি। ভেবেছিলাম খুব বেশি হলে আঁকজোঁক করার মতন চৈতন্য হবে। এযে রীতিমত সোনায় সোহাগা। ওকে খুশি করতে আরও দুটো আরশোলা ঝাঁটা মেরে কাছে নিয়ে আসলাম। সেগুলোও পটাপট ওর পেটে চালান হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। বুদ্ধি বাড়লে খিদেও নিশ্চয়ই বাড়ে।

বিজ্ঞানীকে অত্যাধিক উচ্ছ্বসিত হতে নেই। তাই গলায় গাম্ভীর্য এনে জানতে চাইলাম, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে কোনও বক্তব্য আছে তোমার?”

“অবশ্যই আছে। আচ্ছা বল, আফ্রিকান স্প্রিংহেয়ারের একটা প্রজাতি অন্ধকারে গোলাপি আভায় জ্বলে কেন?”

আচমকা পাল্টা জিজ্ঞাস্যে থতমত খেয়ে গেলাম আমি। আমতা-আমতা করে বললাম, “ঠিক জানি না।“

“কারণ ওরা বায়োফ্লুরোসেন্ট। ওদের লোমে পর্‌ফিরিন থাকে। অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে,” চিবিয়ে-চিবিয়ে, ধীরে সুস্থে উত্তর দিল সে।

আমি ঈষৎ ভেবলে গেলাম। বললাম, “এর সঙ্গে আবহাওয়ার কী সম্পর্ক?”

“কিচ্ছু না। তোমাকে এমনি-এমনি ঘেঁটে দিলাম,” টিরগিটি-র শরীরে লাল, সবুজ, কমলার ছটা খেলে গেল পরপর। সে উদ্ধতভাবে চেয়ে রয়েছে টেবিলের কোণায়, একটা নিরুপায় মাছির দিকে।

‘বুদ্ধিবীজী’ যন্ত্রের পারদর্শিতা আর আমার নৈপুণ্যে আজ আমিই বিমোহিত। নিজের গরিমা ঢাকতে পারলাম না আর। অস্ফুটে বলে ফেললাম, “পারফেক্ট!”

ভাবলাম, কাল সকালে খাঁচায় পড়া নেংটি ইঁদুরের ওপরে আরেকটা এক্সপেরিমেন্ট করে ফেলব। কিন্তু দেখলাম টিরগিটি-র মাইন্ড রিডিংয়ের ক্ষমতাও রয়েছে। আমার দিকে ভুরূ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “খবর্দার। মুড়িমুড়কি এক দর করবে না। শেষে নেংটি! সামাজিক স্ট্যাটাস বলে কিছু আছে তো নাকি?”

দমে গেলাম। বললাম, “ঠিক আছে। যাই গিন্নী-কে সুসংবাদটা দিয়ে আসি।“

“দেখলেন? না ঘুমানোর ফল?” আরও গম্ভীর হয়ে গেল টিরগিটি। “আপনার অবস্থা দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। গিন্নী পেলেন কোথায়?”

“ঘরে যেটা রয়েছে…?”

“ওটা পাশ-বালিশ।“

ইনি যখন এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছেন তখন তাই হবে। শোয়ার ঘরের বিছানায় নিঃশব্দে হাত-পা ছুঁড়লাম উল্লাসে। ল্যাবে বুদ্ধিবীজী বানানো সোজা কথা নয়। নোবেল এল বলে।

“লাথি মারছ কেন ছোটলোকের মতন?” খন্‌খনে চিৎকারে ঘাবড়ে গেলাম। পাশ-বালিশও চোখ রাঙাচ্ছে, কি আশ্চর্য! এটাকেও যন্ত্রে ট্রাই করে দেখব নাকি?

বুধবার, ৫ মে, ২০২১

অমলবাবুর বন্ধু

“একি!”

চমকে উঠলেন অমলবাবু। তাঁর চোখ আটকে রয়েছে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো কামরূপ এক্সপ্রেসের এস ১৩ কামরার দিকে। সামনের দরজা থেকে পাঁচটা জানালা পিছিয়ে এলে গরাদের ফাঁক দিয়ে যে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে, তাকে তিনি চেনেন। বাম গালের কুৎসিত জরুল, ভুরূর ওপরে কাটা দাগ, টিয়াপাখির ঠোঁটের মতন খাড়া নাক আর কোটরাগত দুটো চোখ। সবই মিলে যাচ্ছে। সমরেশ-কে চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয় তাঁর। চকিতে নিজেকে গুটিয়ে বেঞ্চের পিছনে, প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় হুমড়ি খেয়ে পড়লেন তিনি। ট্রেনটা না যাওয়া পর্যন্ত এখানে লুকিয়ে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।


মাঝেমধ্যে ভরদুপুরে জলপাইগুড়ি রোড স্টেশনে এসে বসে থাকেন অমলবাবু। এখানে বেশীরভাগ সময় ঝ্যাংক্ল্যাং শব্দ করে মালগাড়িগুলো আসে। দু’একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়ালেও বোতলে জল ভরার প্রয়োজন না থাকলে প্ল্যাটফর্মে কেউই সাধারণত নামে না। মিনিট পাঁচেকের হৈচৈয়ের পরেই শান্ত হয়ে যায় চারিদিক। ওভারব্রিজের মাথা ডিঙ্গিয়ে রোদ্দুর মাখা আকাশে মনখারাপের ঘুড়ি যখন একলা-একলা পাক খায় তখন চকচকে রেল লাইনগুলো যে কি লোভনীয় লাগে তা কেবলমাত্র অমলবাবুই বোঝেন। আজও তাঁর মন ভালো নেই। সকালে গিয়েছিলেন সাত মাসের পাওনা বাড়িভাড়ার তাগাদা করতে। লাজুক ভাবেই চেয়ে চিন্তে হাত পেতেছিলেন। কিন্তু ভাড়াটিয়া বেজায় রেগে পাড়ার গুন্ডা ডেকে আনল। তারপরে দেদার গালিগালাজ আর গলাধাক্কার উপহার। বলল ক্লাবে এসে দলিল জমা করে যেতে, নইলে রাস্তায় ফেলে মারবে। এপর্যন্ত তাও ঠিক ছিল। আসল মুশকিলটা হল অমলবাবু বাড়ির দলিল কোথায় আছে সেটাই জানেন না। মামাবাবু বলে যাওয়ার সময় পাননি। এমন নিঃসঙ্গ অসহায় পরিস্থিতিতে পড়লে মানুষ বন্ধু খোঁজে। অথচ অমলবাবু বারবার মাথা ঝাঁকালেন। সমরেশ-কে তাঁর বেজায় ভয়। মা বলতেন, সে এলে বিপদ দশ গুন বেড়ে যায়।

তাকে শেষ দেখেছিলেন বছর চল্লিশ আগে। তিনসুকিয়া ছেড়ে চলে আসার সময় বাসস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ টিপেছিল। অমলবাবুর বাবার চাকরী ছিল ডিগবয়ে। সেই সূত্রেই নর্থ আসামে বসবাস। মিশনারি স্কুলে চলত পড়াশোনা। কিন্তু কেউই মিশত না ওনার সাথে। বরং রাস্তাঘাটে ছেলেপুলেরা পিছনে লেগে অকারণে দুঃসহ করে তুলত বিকেলগুলো। সেই ঘরকুনো আঁধারেই একদিন হঠাৎ ছাদের সিঁড়িতে আলাপ হয়েছিল সমরেশের সাথে। একেবারে বিপরীত স্বভাবের ছেলে। যত্রতত্র বেয়াড়াপনা করতে তার উৎসাহের কখনও ঘাটতি হত না। অবশ্যি এই চারিত্রিক বৈপরীত্যের জন্যেই হয়তো ওদের সখ্যতা এত গাঢ় হয়েছিল।

গোলমাল হল সেখানেই। তিনি যা পারতেন না, ও নিঃশব্দে সেরে আসত তা অবলীলায়। তাঁর কোনও বারণই কানে তুলত না সমরেশ। তবে ওর সকল দুষ্টুমির দায় অদ্ভুত ভাবে এসে পড়ত ওনার কাঁধেই। কঠিন সাজা পেয়েও মুখ খুলতেন না তিনি। স্থানীয় উপজাতি নেতার ছেলে দারুক বোরা একদিন ঢিল মেরে অমলের কপাল ফাটিয়ে দিল। তার দিন সাতেক পরেই কে যেন ছেলেটাকে পিছন থেকে বস্তায় পুরে জম্পেশ পেটাল টিঙরাই নদীর চরায়। স্বাভাবিকভাবেই ওরা দুষল কিশোর অমল-কে। দাঙ্গা প্রায় বাঁধে বাঁধে। বেদম ঠ্যাঙানি খাওয়ার ভয়ে প্রথমবার বন্ধুর নাম ফাঁস করেছিলেন তিনি। কিন্তু কেউ সমরেশ-কে চিনল না। উল্টে ডাক্তারজেঠু ওকে বললেন, ‘প্যাথলজিকাল লায়ার’। বাবা তাঁকে জলপাইগুড়িতে মামারবাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। তারপরে বহু বছর কেটেছে। ঘুমিয়ে, ঝিমিয়ে মুছে গেছে অবশিষ্ট মেরুদণ্ড। বিস্মৃতির আড়ালে নিখোঁজ হয়েছে সমরেশও।

ঘন-ঘন দু’বার হুইসেল দিয়ে ইঞ্জিন ড্রাইভার জানান দিল যে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়েছে। আবার হারিয়ে যাবে সমরেশ। তাকে শেষবারের মত দেখবার আশায় অমলবাবু বেঞ্চের পিছন থেকে উঁকি দিলেন। আর তাতেই ওঁর বুক ধড়াস করে উঠল। জানালার রডে মুখ লাগিয়ে সোজাসুজি এইদিকেই চেয়ে রয়েছে সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিতে প্রচ্ছন্ন রয়েছে লুকোচুরির কৌতুক।

পড়িমরি করে দৌড়ে নিকটস্থ শৌচালয়ে ঢুকে, দরজার আড়ালে দাঁড়ালেন অমলবাবু। ধরা পড়ে গেছেন তিনি। তবে দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকা হৃদস্পন্দনের সাথে তিনি অনুভব করলেন মন খারাপ আর নেই। উল্টোদিকে, আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখে রোজের মত মুষড়ে পড়লেন না। দেখলেন, ফিরে এসেছে গর্তে ঢোকা চোখের উজ্জ্বলতা। বাম গালের জরুলটাকেও কুৎসিত দেখাচ্ছে না আর। সমরেশ নেমে পড়েছে প্ল্যাটফর্মে। এবারে নিশ্চিন্তি।।