রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২১

খাদ্য বিভ্রাট


 রুই মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল আর তার সাথে গরম-গরম ভাত। ব্যস, আর কি চাই। হ্যাঁ, দুটো ভাজাভুজি হলেও মন্দ হয়না। যেমন ধরা যাক খান দুই কুমড়ো ফুল ভাজা, মাঝারি আকারের বেগুনি এবং ফুলকপির বড়া। সপ্তমী পুজোর সাত্ত্বিক আহার যাকে বলে। সশব্দে ঢেঁকুর তুলে আসন ছেড়ে উঠলুম। ভালো-মন্দ খাওয়ার পর অধিক নড়াচড়া স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর, তমুক বাবা বলেছেন। হুঁ হুঁ, আমি ওনার উপদেশ অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলি। বয়স তো কম হল না। বেশি খাটুনিতে কলকব্জা রাতারাতি বিকল হয়ে পড়ে। তাই ভুঁড়ির দুপাশে বালিশের ঠেকো দিয়ে আমি আরাম করে দাঁতে কাঠি দিলুম। কিন্তু কপালে সুখ সইল না। করোনাসুরের দৌরাত্ম্যে বারান্দা থেকেই এবারে পূজা-পরিক্রমা সারতে হচ্ছে। তাই, গিন্নির মেজাজ সেই মহালয়া থেকেই বেজায় গরম। আমায় আয়েশ করতে দেখেই খিঁচিয়ে উঠলেন- ছোটলোকের মতন দাঁত খুঁটছ কেন?।

-কাঁটা ঢুকলে সবাই খোঁটে। এ তো আর নাক নয়।

-কচ্ছপের মতন এত ঝেড়ে, বেছে খাও। তাতেও কাঁটা ঢোকে?

বুঝলুম, তিনি আমায় সহজে ছাড়বেন না। সকাল থেকে রাঁধাবাড়া করানোর বদলা নিতে হবে বৈকি। এখন থেকেই খোঁচা মেরে বৈকালিক অশান্তির মেঘ জড় করার চেষ্টা করছেন। আমি জেনেশুনে তো আর সেই উদ্দেশ্য সফল হতে দিতে পারি না। খোঁচাখুঁচি বন্ধ রেখে বললুম- ধীরেসুস্থে, বুঝেশুনে খাওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। আমার সাথে একবার যা হয়েছিল না....

গিন্নি দেখলুম গাল ফুলিয়ে উদাস চোখে দেওয়ালের টিকটিকি দেখছেন। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়ে আমি শুরু করলাম।

-সে অনেককাল আগের কথা। তখন রমরমিয়ে চলছে আমার হস্টেল জীবন…

পুজোর ছুটি যত এগিয়ে আসছে, মেসে খাবারের মান পাল্লা দিয়ে নিম্নগামী হচ্ছে। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছল মহালয়ার দু’সপ্তাহ আগে।  সিভিলের ‘ঘুঁটে’ হল মেস ম্যানেজার। একেই সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা সবেতেই অতিশয় কৃপণ, তার ওপরে মেস বিল কমানোর দায় পড়লো তার ঘাড়ে। ফলস্বরূপ, দু’বেলার আহারই তখন আবাসিকদের কাছে রীতিমত বিভীষিকা। দিনের পর দিন মেসের অখাদ্য কোনোমতে পেটে ঢুকিয়ে ক্রমাগত শীর্ণ হওয়া ছাড়া উপায় কি? জলবৎ তরলং ডাল আর মোটা চালের ভাত ছাড়া কিছুই বেরত না হেঁসেল থেকেমাছ, মাংস তখন অলীক স্বপ্ন। কোনোদিন ভাগ্য নিতান্তই সুপ্রসন্ন হলে ডিমের ঝোল জুটতযদিও আকার বিচার করলে ডিমগুলো মুরগির না চড়াইয়ের তা নিয়ে সন্দেহর যথেষ্ট অবকাশ ছিলনিরুপায় হয়ে, হাতখরচা বাঁচানো সীমিত সঞ্চয় ভাঙ্গিয়ে, মাঝেসাঝে কলেজমোড়ের হোটেলে মুখের স্বাদ বদলাতে যেতুম।

তেমনই এক নিরামিষ দুপুরে, বাড়ি আসার আগেরদিন, মেসে লাঞ্চ সারছিলুম। মনে-মনে ‘ঘুঁটে’র চোদ্দগুষ্ঠির নামে শাপ-শাপান্ত চলছে। হঠাৎ, মুখে মাছের কাঁটা পড়তে বেশ অবাক হলুম। পাতে মাছ নেই, অথচ মুখে মাছের কাঁটা? এ তো দারুণ চমক। পরম যত্নে সেটাকে দাঁত দিয়ে ছাতু করার চেষ্টার মধ্যেই টেবিলে বাকিদের বললুম- আজকে দেখছি মাছের কাঁটা দিয়ে ডাল করেছে।

নিমেষের মধ্যে শোরগোল শুরু হয়ে গেল। মা দুর্গার আশীর্বাদে শুধু আমি ভালো খাবার পাবো, আর বাকিরা বঞ্চিত থাকব, সেটা একেবারেই অনুচিত। আমার পাশের রুমের সুমিত, টেবিলের মাঝখানে রাখা ডালের বড় গামলায় মিনিট দুয়েক হাতা দিয়ে খুব ভালো করে ঘেঁটে কনফার্ম করলো, মাছের শরীরের কোনো প্রত্যঙ্গই সেখানে নেই। বড়ই আশ্চর্য ঘটনা। গত সপ্তাহেই আমার ভাতে বড়সড় বড়্‌শি পড়েছিল। কামড়াতে গিয়ে প্রায় দাঁত ভাঙ্গার জোগাড় হয় আর কি। আমি জিভ দিয়ে নেড়েচেড়ে ঠাহর করে দেখলুম, এটা তেমন ধাতব কিছু নয়। কিন্তু সহজে বাগেও আনা যাচ্ছে না।

তোর মাথাটা গেছে। এই দুর্ভিক্ষের বাজারে মাছের স্বপ্ন দেখছিস কোথা থেকে? -বিপিন ওর স্বভাবসিদ্ধ তাচ্ছিল্য মিশিয়ে বলল।

অকারণে কথা শুনলে তো চুপ করে থাকা যায় না। প্রমাণ দাখিল করতেই হবে। ওদিকে, দাঁতের অনেক ব্যায়ামের পরেও তথাকথিত মাছের কাঁটা তার আকার অবিকৃত রেখেছে বুঝতে পারছি। ততক্ষণে মোটামুটি মায়া কাটিয়ে এনেছিলুম ওটার ওপর থেকে। ভেবেছিলুম গোটাই গিলে ফেলব। কিন্তু বিপিনের চ্যালেঞ্জের পর, মুখের থেকে মাছের কাঁটা বের করে থালার পাশে রেখে বললুম- তোরাই দেখে বল।

সুমিত ওয়াক শব্দ করে টেবিল থেকে উঠে গেল। পিছনেই ছিল হাত ধোয়ার বেসিন। সেখানে হড়হড় করে ঢেলে দিল যেটুকু খাবার ওর পেটে ছিল। বাকিদের অবস্থাও তথৈবচ। বিপিন খাওয়া ছেড়ে দুচোখ বন্ধ করে বসে আছেযেই জিনিসটা নিয়ে দের এত বিতৃষ্ণা, আমি তাকে আঙ্গুলে তুলে ভালো করে দেখলাম। নাহ, ওটা মাছের কাঁটা বা বড়শির টুকরো নয়। ওটা পায়ের বুড় আঙ্গুল থেকে সুন্দর করে কাটা বেশ মোটাসোটা নখ। সম্ভবত মেসের রাঁধুনি মামু আরও সুস্বাদু ডাল বানানোর জন্যে কোনো গোপন রেসিপি ব্যবহার করেছে। নখটা এখনও আমার সংগ্রহে আছে চাইলে দেখাতে পারি।

-খবর্দার, একদম না। ছ্যাঃ এত নোংরা ব্যাপার, গিন্নি মুখ বিকৃত করে বললেন।

-কিন্তু সেই নখ আমাকে আরও বড় বিপদের থেকে রক্ষা করেছিল। আমি রহস্য রেখে বললুম।

-সে কিভাবে?

-সে’দিন বিকেলে পেট আনচান করছিল বলে রাতে কিছু খাব না ঠিক করলুম। অথচ রাতে কিনা আয়োজন হল চিলি চিকেন আর ফ্রাইড রাইসের। ছুটির আগে ‘ঘুঁটে’ সবাইকে চমকে দিয়ে নাম কিনবে ভেবেছে। আমি পেট চেপে ঘরে শুয়ে রয়েছি আর সকলে মহানন্দে ভুঁড়ি ভোজ করছে। ঘুঁটে খেতে বসল একেবারে শেষ ব্যাচে। আমাদের মেসে চিলি চিকেনেও ঝোল থাকতো। ‘ঘুঁটে’, রাঁধুনি মামুর কাছে ঝোলে ডোবা একটা সন্দেহজনক তেজপাতার খবর নিল। ওর তৎপরতায় অবিলম্বেই সকল সন্দেহের নিরসন হয়ে গেল। ঝোল থেকে যেটাকে বের করা হল সেটা একটা আস্ত নেংটি ইঁদুর। মরে কাঠ হয়ে গেছে। ওইটুকু উঁচিয়ে থাকা লেজ দেখে তেজপাতার ডাঁটি মনে হয়েছিল বাইরে থেকে।

-তারপর? গিন্নির ভুরূ আকাশে উঠল।

-তারপরে আর কি। খবর শুনে গোটা হস্টেল হাসপাতালে ছুটল। আমি ততক্ষণে বেশ সুস্থ বোধ করছি। দু’হাত জড় করে নখ দেবতাকে প্রণাম করে ব্যাগ গোছানো আরম্ভ করলুম। বাকি সবাই সে’বারের পুজোতে প্লেগ, কলেরার ভয়ে ঘরবন্দি হয়ে ছিল। এরপরেও দেখেশুনে না খেলে চলে, কি বল? 

টুকলির দেবতা


কন্ট্রোল সিস্টেমের উত্তর লিখতে বেশ চাপ খাচ্ছিলাম প্রশ্নগুলো সব ঘোর-প্যাঁচওয়ালা কোনো কিছুরই সোজাসাপটা জবাব নেই সামনের বেঞ্চে অচিন ঘাড় গুঁজে লিখেই যাচ্ছে পাতার পর পাতা প্রথম দেড়-ঘণ্টাতেই দুবার এক্সট্রা পেজ নিয়েছে কি এত সাহিত্য চর্চা করছে কে জানে  আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসলাম জানা প্রশ্নগুলোর, খুবই সংখ্যালঘু তারা, উত্তর লেখা হয়ে গেছে সেই কখন শুধু একটাতে পাশ নম্বর উঠবে কিনা সন্দেহ এ’বারে গাঁজাখুরি গল্পেই পাতা ভরাতে হবে নইলে ফাঁকা খাতা দেখে পরীক্ষক শুধু পরিচ্ছন্নতার জন্যে এক-দুই নম্বর দেবেন

বুদ্ধির শিকড়ে ধোঁয়া, থুড়ি হাওয়া দেওয়ার জন্যে ভাবলাম টয়লেট থেকে ঘুরে আসি করিডোর থেকে সামান্য এগিয়ে, ডান হাতে ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টে রয়েছে মেন্‌স রুম সেখানে পৌঁছে দেখলাম আবহাওয়া বেশ করুণ মেকানিক্যালের শুভায়ু, একটা বন্ধ বুথের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত দরজায় টোকা মারছে আর কাতর গলায় অনুরোধ করছে,একবার খোল না প্লিজ! এভাবে দেরি করালে পাশ করবো না মাইরি

আহারে, বেচারার বোধহয় খুব জোরে পেয়েছে’, আমার করুণা হল শুভায়ুর ওপরে কলেজে আসার সময় পথে দেখা হয়েছিল ওর সাথে কি সুন্দর হাসিখুশী ছিল ছেলেটা এখন একেবারে বিধ্বস্ত। অসময়ে আসা তাগাদা মানুষের ওপরে ঝড় বইয়ে দেয় তার ওপরে যদি সেটা পরীক্ষা চলাকালীন হয় তাহলে তো আর কথাই নেই এই ব্যাপারে আমার থেকে বেশি ভালো জ্ঞান আর কারই বা থাকতে পারে উচ্চ-মাধ্যমিকে, ফিজিক্স সেকেন্ড-পেপার পরীক্ষা মনে আছে?.কে.ঘোষ মেমোরিয়াল স্কুলে আধ ঘণ্টা ধরে হন্যে হয়ে টয়লেট খুঁজেছিলাম প্রশ্নপত্র থেকে যে সকলের একসাথে ফুড-পয়েজনিং হতে পারে তা ধারণার বাইরে ছিল। আমি অভাগার মতন যেদিকেই গেলাম, খালি বন্ধ দরজা পেলাম। উফ্‌, সেই রুদ্ধশ্বাস আধ ঘণ্টায় আরও কত দুর্ঘটনাই না ঘটতে পারত এতদিন পরেও আবার শিউরে উঠলাম কিছু-কিছু অভিজ্ঞতা আধ ঘণ্টায় মানুষের বয়স কয়েক বছর বাড়িয়ে দেয়

শুভায়ু, তুই পাশেরটাতে যা না, আমি কে পরামর্শ দিলাম বিপদ কালে বুদ্ধিনাশ হয়েছে নাকি ছেলেটার?ই বিশেষ বুথের ওপরেই ওর এমন অমোঘ আকর্ষণ কেন? পাশেরটাও চলনসই পরিষ্কারচোখ বন্ধ রেখে কাজ সেরে আসা যেতেই পারে

না রে হতভাগা আমার ফ্লুয়িড ডায়নামিক্সের বই এর ভিতরে রাখা আছে ভেবেছিলাম, মাঝখানে এসে চোখ বুলিয়ে নেব সূত্রগুলো কিছুতেই মনে থাকে না’, শুভায়ু উত্তেজিত হয়ে বলল আমাকে, ‘কোন্‌ পেটের রুগী কখন থেকে বসে আছে দরজা খুলছে না, সাড়াও দিচ্ছে না

আঃ, এই ব্যাপার, আমার মাথায় লাইট বাল্ব জ্বলল এতক্ষণে বুঝলাম, কেন এক ঘণ্টার পর থেকেই ছেলেপিলেরা বাইরে যাওয়ার আশায় হাত তুলে বসে আছে সকলেই বেশ সেয়ানা তো!

ভাই, কে আছিস? জলদি বেরিয়ে আয় অথবা, পারলে শুভায়ুর বইটা দরজার তলায় দিয়ে দে, আমি নরম গলায় বললাম, ‘বন্ধুর বিপদের সময়ে এগিয়ে আসবি না?’

উহু, দরজার ওপাশ থেকে চাপা আপত্তি এলো আরও নেগোসিয়েশন চালাতে হবে। কঠিন খদ্দের।

তবেরে শালা, খুলবিনা! ইয়ার্কি পেয়েছিস?, শুভায়ু সুক্ষ আলাপচারিতার ধার ধারে নাগলার সপ্তম সুর শুনে বোঝাই যাচ্ছে ছেলেটা অনেক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমি বাধা দেওয়ার আগেই, সে তার বড়সড় শরীর নিয়ে বুথের দরজা মারল জব্বর ধাক্কা সরকারী কলেজের ততোধিক সরকারী দরজা বেচারিরা অকারনে উটকো ঝামেলা সহ্য করবে কেন? দরজার দুই পাল্লাই এক সাথে কর্মবিরতিতে চলে গেল

আমরা বিস্ফারিত চোখে দেখলাম, ইলেক্ট্রিক্যালের প্রফেসর কার্ত্তিকবাবু, একহাতে প্যান্টুলুন এবং আরেক হাতে ভাঙ্গা দরজার ভার সামলে কোনোমতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি ভয়ানক দেখে কাপুরুষ শুভায়ু তৎক্ষণাৎ পিঠটান দিল আমি আবারভাবে কাউকে বিপদের মুখে ফেলে রেখে যেতে পারিনা। কাছে যাওয়া ঠিক হবে কিনা ভেবেখানেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে রইলাম কার্ত্তিকবাবু দৃশ্যতই রীতিমত ঝামেলায় পড়েছেন ওই নটরাজের ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে কোনটা অগ্রাধিকার বেশি তার হিসেব কষে যাচ্ছেন। দরজা ধরলে পাজামার মায়া ত্যাগ করতে হবে। অন্যথা, ভারী পাল্লা দুটোকে কাঁধে নিয়েই বাকি কাজ সম্পন্ন করতে হবে আমি ওনার সাহায্যার্থে দু’পা এগিয়েও মাঝপথে মনোবল হারিয়ে ফেললাম সারা জীবন ভয়ানক দুঃস্বপ্নের বোঝা টানার সাহস খুব কম লোকেরই থাকে।

চিন্তা করবেন না, আমি এখুনি হেল্প ডাকছি’, স্যারের সাথে দৃষ্টি বিনিময় এড়িয়ে, অকুস্থল ত্যাগ করলাম। তারপরে সোজা ঢুকে পড়লাম নিজের পরীক্ষার হলে ভবিষ্যতে আমায় কার্ত্তিকবাবুক্লাসে প্রক্সি মারতে হবে ওনার অমূল্য জ্ঞান-ভাণ্ডারের দরজা, আজ থেকে আমার জন্যে যে চিরতরে বন্ধ তাতে কোনো দ্বিমতের অবকাশ নেই। অবশ্য সে’সবের আগে ওনাকে ওই দরজার তলা থেকে সসম্মানে বের হতে হবে এই দুর্ঘটনার পরে আশা করি উনি বুঝবেন, কোনো অসহায় হবু ইঞ্জিয়ারকে টুকলিতে বাধা দিলে, তার ফল কখনও মঙ্গলময় হতে পারে না। বিশ্বকর্মা আছেন, তিনি সব দেখছেন।।

ভাসান


তালপুকুরে পা ডুবিয়ে বসে ছিল অনিক। হ্যাঁ, তালপুকুরই হবে, কেননা চারদিকে অনেক লম্বা-লম্বা তাল গাছ। জামরুল আর কাঁঠাল গাছও আছে যদিও। কিন্তু অনিকের তালপুকুর নামটাই বেশি ভালো লাগে। মাছগুলো বেশ আলাপি, দল বেঁধে অনিকের পায়ের আঙ্গুল ঠুকরে দিচ্ছে। সুড়সুড়িতে অনিক খিলখিল করে হাসছে। এরকম মজার মাছ ও আগে কোনোদিন দেখেনি, ধরা পড়ার কোন ভয়ই নেই ওদের। একমাথা রোদ নিয়ে শান বাঁধানো ঘাটে বসে আছে অনিক। রোদ এত ঝলমলে, কিন্তু গায়েই লাগছে না। একেই মিঠে রোদ বলে বোধহয়। তবে তালপুকুরের ব্যাপারটাই আলাদা।  এখানে সকলে অনিক কে বোঝে আর অনিকও ওদের সব গুঞ্জন শুনতে পায়। ঝিকমিক করা ছোট ঢেউ বা ভাসতে থাকা পাতা প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব ওয়েভলেন্থ আছে, যোগাযোগের। সবই অনিক বুঝতে পারে। ওই যেমন ধাপের কাছে ভাসতে থাকা কাঁঠাল পাতাটা একটু আগে দেওয়ালের শেওলাকে সম্ভাষণ করল। অনিক টের পেয়ে মুচকি হেসেছে। উত্তরের পারুল গাছের নিচে খুঁটে খাওয়া কাঠবেড়ালিটা অনিকের হাসি শুনে যে চমকে তাকাল, সেটাও অনিকের নজর এড়ায় নি। ব্যাটা নির্ঘাত ঘাবড়ে গেছে এই ভেবে যে, মানুষটা কি করে ওদের সব রহস্য জেনে যাচ্ছে। অনিক হাসি থামিয়ে এবারে গম্ভীর হয়ে গেল। শুধু গাছ, পাখি, পাথরের কানাকানি শোনার জন্যে তো আর সে এখানে বসে নেই। ঠায় অপেক্ষায় থেকে খুব ক্লান্ত লাগছে ওর। প্রতিদিন নানারকম কারণ দেখিয়ে অনিক কে বসিয়ে রেখে কি যে মজা পায় অলি!

বিরক্তিতে ভুরু দুটো প্রায় জোড়া লাগতে যাচ্ছিল, তখুনি অনিক টের পেল, চারদিকের আলোতে একটু গোলাপি আভা, আর তার সাথে কানে আসছে রিনরিনে চুড়ির শব্দ। গাছের কোটরের ডাহুক, ঘুঘুরা তাদের ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ রেখে এদিকেই তাকিয়ে আছে। তালপুকুর এখন কাঁচের মতন স্থির। অনিক বুঝল অলির আসার সময় হয়েছে।

‘তুমি রেগে গেছ অনিক?’

অলির সুরেলা গলা অনিকের বুক ছুঁয়ে গেল। একটা চাপ ব্যাথা উঠল গলার কাছে দলা পাকিয়ে। ওটাকে অভিমান বলে। মৌমাছিরা না এলে জুঁই ফুলেরও এরকম গোসা হয়।

‘অঞ্জলি দিতে এলেনা কেন?’

‘কিসের অঞ্জলি অনিক?’

খুব রেগে গেল অনিক। রাগলে আবার মাথায় ব্যাথা হয়। একসাথে অনেক পিঁপড়ে কামড়ানোর মতন। তা স্বত্বেও রেগে গেল সে। প্রতি বছর অনিক আর অলি স্বরস্বতি পুজোর অঞ্জলি দেয় পাশাপাশি। ছোটদাদু ঠাকুরমশাই কে ডেকে বলেন, ‘এই উত্তম-সুচিত্রার মাথায় একটু বেশি করে শান্তির জল ছেটান’। অনিক আড়চোখে দেখে, অলি লজ্জায় লাল। নিজেকে উত্তম ভাবার চেয়ে ওকে সুচিত্রা ভাবতে আরও ভালো লাগে অনিকের। ছোটদাদু খুব মজার লোক, কথায়-কথায় ওদের পিছনে লাগেন। অনিক কে কাঁধে করে বিন্নাগরের হাটে নিয়ে গিয়েছিলেন সেবার। ওখানে কত লোক আর নাগরদোলা। অনিক ঠোঙ্গা ভরে চিনেবাদাম খেয়েছিল। ফুচকার দোকানও ছিল, কিন্তু ওর পেটে ব্যাথা বলে দাদু কিনে দেয়নি। ব্যাথা হবে নাইবা কেন। আগের দিন পুকুরে জাল ফেলে কত-কত মাছ ধরা হয়েছিল। চার-পাঁচ রকম পদ বানিয়েছিল দিদিমা।  সারা গ্রামের লোক নেমন্তন্নে বসেছিল উঠোনে। অনিক এক থালা মাছ নিয়ে, পাশে বসা অলির গালের তিলের দিকে তাকিয়ে ছিল। এঁটো মুখে গালে একটা চুমু খেলে অলি কি রাগ করবে? আবার কোথা থেকে কোথায় চলে গেল অনিক। ওই ওষুধগুলোর জন্যেই যত মুশকিল, ভাবনা চিন্তাগুলো কেমন যেন লাগামহীন হয়ে গেছে। অনিকের এখন অলির ওপরে রাগ দেখানোর কথা, সেটা ছেড়ে কোথায় বিন্নাগরের হাট আর কোথায়ই বা সেই কালো তিল।

ঝিলমিল করে হেসে উঠল অলি। ওকি বুঝতে পারছে অনিক কি ভাবছে? সবাই সব জেনে ফেললে তো খুব মুশকিল, নিজের মতন করে ভাবার কিছুই থাকবে না। কিছু জিনিস ব্যক্তিগত থাকাই ভালো। অলি হাসলে শব্দ হয়না, কেমন যেন আলোর অনুভূতি হয়। অনিক কোনোদিন অলিকে হাসতে শোনেনি, ওকে হাসতে অনুভব করেছে।

‘তুমি আমার সাথে অঞ্জলি দিলে না যে আজ! আমি অপেক্ষায় ছিলাম, আর ছোটদাদুও’।

‘আজ তো কোনো পুজো নেই অনিক। ছোটদাদুও সেই কবেই চলে গেছেন। তুমি অকারণে আকাশ পাতাল ভাবছ। এদিকে একবারও তাকালে না। দেখবে নাকি আমাকে? কেমন লাগছি আমি?’

গোলমাল হয়ে গেল অনিকের। তাহলে কি ওটা বিন্নাগরের হাট ছিল না? সেজোমামা খই ছড়াচ্ছিল আর কতগুলো লোক গুনগুন করে ‘হরিবোল’ বলছিল। কত বয়স ছিল ওর? নাহ মনে নেই। অনিক বুঝতেই পারেনি ছোটদাদু কে ঘুমাতে দিয়ে ওরা এত কাঁদছে কেন। চুল্লিতে আগুন লাগতেই হেসে ফেলেছিল ও। সবাই ভেবেছিল অনিক মনের দুঃখে হাসছে। কিন্তু একদম নয়, বোকারা ভাবে পোড়ালেই সব শেষ হয়ে যায়। তাহলে, কিভাবে ছোটদাদু দিব্যি ওকে ফুচকা খাওয়ানোর কথা বলছিল কানে কানে? মিত্তির কাকু ওইদিনই বাবা কে ডাক্তারের খোঁজ দিয়েছিল, অনিকের জন্যে।

‘তুমি এত গোলাপি কেন অলি? আমার চোখে ব্যাথা হচ্ছে তো’

অনিক বেশিক্ষন তাকাতে পারলো না। পৈঠাতে মাত্র দু’হাত দূরেই বসে আছে অলি, কিন্তু বারংবার ভেঙ্গে টুকরো-টুকরো হয়ে যাচ্ছে কাঁচের মতন। পরক্ষনেই জুড়ে তৈরি করছে একটা ঝাপসা ছবি। কিছুতেই স্থির থাকছে না। ওর হাসির টুকরোগুলো, গালের তিল, ঘাড়ের কাছের কোঁকড়ানো চুল সব কেমন একটা দুরন্ত গতিতে পাক খেয়ে ছিটকে সরে যাচ্ছে। জ্বর হলে ছোটবেলায় অনিকের এরকম হত। চোখ বন্ধ করলেই কতগুলো বাক্স আর বল ক্রমাগত ছোট থেকে প্রকাণ্ড বড় হয়ে গিয়ে মাথার ভিতরে দামামা বাজাত। অনিক ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করে জেগে ওঠার চেষ্টা করত। ওর কি আবার জ্বর এসেছে? ওর খুব ইচ্ছে করছে অঞ্জলি দিতে, সেদিনের বাকি থেকে যাওয়া অঞ্জলি।

‘তুমি আবার ছেলেমানুষি করছ অনিক। সেই কোন ছেলেবেলার কথা ভাবছ তখন থেকে। তোমার মনে পড়ে কবে আমরা শেষ বারের মতন বসেছিলাম পাশাপাশি?’

অনিক মাথার ভিতরে হাতড়াতে শুরু করে। গতকালই তো কথা হল। না না, কালও গুড়ো-গুড়ো কাঁচের মতন এসেছিল অলি, যাকে ভালো করে দেখা যায় না। বোঝাই যায় না অবয়ব টাকে। ভাবনার অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পিছলাতে পিছলাতে থামল অনিক। একটা সিনেমার পর্দায় দেখতে পেল ছেলে মেয়ে দুটোকে, সোনালি ধান খেতের পাশের কাঁচা রাস্তাতে হাঁটছে। ওই ছেলেটাও অনিক কে দেখতে পেল নাকি? কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এদিকেই। মেয়েটার গলা অনেকটা অলির মতন, ‘তুমি বড় হয়ে আমায় বিয়ে করবে?’

একটা হ্যাঁচকা টান অনিক কে ওই সিনেমার পর্দার সামনে থেকে এক লহমায় সরিয়ে আবার তালপুকুরের আলো ছায়া ঘেরা ঘাটে এনে ফেলল। মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছে অনিকের। সামনের দৃশ্যগুলোর এত দ্রুত নড়াচড়া ওর চোখ নিতে পারে না। দু’হাতে চেপে হাঁটুতে মাথা গুঁজে রইল খানিকক্ষণ।

‘অলি, ওটা কি আমরা? তুমি আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে? আমি নিশ্চয়ই হ্যাঁ বলেছিলাম, তাইনা? তারপরে কি হল অলি? আমরা কি বড় হইনি? তোমাকে তো সেই ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসি। খালি ভয় পেতাম তুমি হয়তো সেরকম করে ভাবোনা। এই তালপুকুরের পাড়ে আমরা কত গল্প করেছি দুজনে মিলে, বেঁচে থাকার…’

চারিদিক আবার চকচক করে উঠল, মানে অলি হাসছে। কিন্তু হাসছে কেন?

‘তালপুকুর তো তোমার মনের কল্পনা অনিক। এরকম আবার কিছু আছে নাকি? মনে আছে ছোট্ট বাবুল বারান্দায় বসে কবিতা পড়ছিল? বাবুদের তালপুকুরে… আর তুমি আমার ঠোঁটে ঠোঁট দিয়েছিলে দিদিমার পান সাজার ঘরে।’

‘হ্যাঁ অলি, মনে পড়েছে তোমার গোলাপি ঠোঁট’, অনিক আরেকটা মুভি থিয়েটারের ভিতরে বসে আবছা দেখতে পেল ছবিগুলো। উঠোনের গাঁদাফুলের ওপরে গঙ্গাফড়িং আর এক বুক মোচড়ানো ব্যথা। অনিকের আরও কিছু জিনিস মনে এল, ’তোমার গলায় কালশিটে ছিল। আমি কত জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে, কিন্তু তুমি কিচ্ছু না বলে কোথায় যেন হারিয়ে গেলে। আমি দিদিমা কে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার কথা, কিন্তু ওরা সবাই চমকে উঠে আমাকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। ওরা সবসময় তাই করে। কেন অলি? আমার কি কোন রোগ আছে?’

তালপুকুরের জল আর স্থির নেই, ঠিক মধ্যিখানে একটা গভীর গর্ত দিয়ে সব জল যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। এরকম হয় নাকি? আগে কোনদিন দেখেনি অনিক। কিই বা যায় আসে। অলির কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে এসবই ওর কল্পনা। এইসব উল্টোপাল্টা চিন্তা খেই হারিয়ে দেয় সময়ের। কোনটা আগে, কোনটা পরে সব তালগোল পাকিয়ে যায়। স্বরস্বতি পুজোর দিন অনিক কে মণ্ডপের সামনে দাঁড়াতে বলে অলি বাসন্তী শাড়িতে সেজে আসবে বলেছিল। এসেছিল কি? বিকেলে বাগানে প্রজাপতির পিছনে ছুটে বেড়ানোর কথা ছিল। সেটাও কি সেদিনই নাকি আরও অনেক পরে? আবার কয়েক জন্ম আগেও হতে পারে। অনিকের আর কিছু মনে করতে ইচ্ছে করছে না। স্মৃতির দেরাজের চাবি হারিয়ে গেছে। চোখের মনির নড়াচড়ার সাথে তলপেট গুলিয়ে উঠছে।

‘তোমার কোনো রোগ নেই অনিক। তোমাকে ওরা বুঝতে পারে না। তুমি যে অনেক বেশী দেখতে পাও। অনেক ফিসফিস তোমার কানে ধরা দেয়। আলোআঁধারির মাঝের পর্দাগুলো, যা কেউ খুঁজে পায়না, সেগুলো তুমি সরাতে ভালবাস। সেই জন্যেই তো আমি তোমার কাছে আসি রোজই। যেমন কালকেও এসেছিলাম তোমার তালপুকুরের ছায়ায়, যেমন তার আগের দিন, আর তারও আগে প্রতিদিন, বছরের পর বছর ধরে’।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল অনিক। যাক, তাহলে ও পাগল নয়। সকলে মিছিমিছি ওর দিকে অনুকম্পার চোখে এতদিন তাকিয়ে এসেছে। শান্তি পেলেও কষ্টটা কিছুতেই যেন যায় না। প্রতিদিনই অলি একই ভাবে ওকে সাহস যোগায়, ভরসা দেয়। অনিক হাত বাড়ালেই ভেঙ্গে ঝুরঝুর হয়ে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। তালপুকুরের পাশে অনিক আবার একা বসে থাকে পরের অঞ্জলির নির্ঘণ্টের জন্যে। একসাথে দেওয়ার কথা হয়েছিল ওদের। কোনো না কোনোদিন অলি নিশ্চয়ই আসতে পারবে।

দধিকর্মার দিন পুকুরে জাল ফেলে এক জলপরী কে পাওয়া গেছিল। সেদিনই প্রথমবার জ্ঞান হারায় অনিক। ক’মিনিট বা ক’ঘণ্টা বা ক’দিন ঘুমিয়ে ছিল খেয়াল নেই। হুঁশ ফিরতে অনিক দেখেছিল ছোটদাদু কে, আরাম কেদারায় বসে উদাস হয়ে জালানা দিয়ে তাকিয়ে আছেন। শুনেছিল বারান্দার চড়ুইরা নিজেদের মধ্যে খাবারের ভাগ নিয়ে ঝগড়া করছে। মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল দিদিমার সাদা থান আর তার পিছনে অলির গোলাপি ঠোঁট আর কালো তিলের মুচকি হাসি। পরম নিশ্চিন্তে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল অনিক। মাথার ব্যথাটাও সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল। আর ইদানিং এই কড়া ওষুধগুলো ওকে খুব দুর্বল করে রেখেছে।


‘তুমি শুনতে পাচ্ছ অনিক? ওরা ভাবছে তোমার ঘুম আর ভাঙবে না, তাই যন্ত্রটা বন্ধ করে দেবে। জলপরীর অপেক্ষা থেকে এবার তোমার ছুটি। এদিকে একবার দেখ, আমি এসেছি সেই বাসন্তী শাড়িতে’।

মুচকি হেসে উঠে দাঁড়াল অনিক। অবশেষে এই অনন্ত ঘূর্ণির হাত থেকে ছাড়া পাবে সে। এতদিনে চিনে ফেলা তালপুকুরের প্রতিটা ঘাস, শ্যাওলাকে বিদায় জানিয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিল জলে। ঢেউগুলো ওকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে গেল পুকুরের মাঝের গর্তের দিকে, যেখানে বিপুল জলরাশি প্রবল প্রপাত সৃষ্টি করে হারিয়ে যাচ্ছে মহাশূন্যের অতল গহ্বরে। অলিকে ভালোবাসার কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা ওকে যে অফুরন্ত সময়ের বৃত্তে বন্দি করে রেখেছিল, আজ তার মুক্তি সেখান থেকে।।

অকাল বোধন


বালিশে আধশোয়া হয়ে পিকলু ঠাকুমার কাছে অসুর নিধনের গল্প শুনছিল। ঠিক যখন দুর্গা ত্রিশূল ছুঁড়বে ভাবছে, তখনই হট্টগোলটা শুরু হল । ঠাকুমা বিরক্তিতে দরজার দিকে তাকাতেই পিকলু ঝুপ্‌ করে খাট থেকে লাফিয়ে সোজা বারান্দায় চলে এল। দেখল, বাড়ির সকলেই বাইরে বেরিয়ে এসেছে। রাত সবে দশটা হলেও, ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের ডাক মাঝরাতের আমেজ এনেছে।

‘কি অইলডা কি? কে মরসে?’ জ্যাঠামশাই আফিমের ঘোরে ঢুলতে-ঢুলতে শুধোলেন। গলায় পাকা ঘুম ভাঙ্গার বিরক্তি। ‘অ রোথিন, আলোডা পিটপিটায় ক্যান?’

‘দাদা, টিউবের চোখ হেই কবেই গ্যাসে তুমি তো জানোই’, বাবা ভুরু কুঁচকে চশমার কাঁচ মুছতে-মুছতে বললেন। ‘কই গো! টর্চখান ফ্যালো একবার।’

শোনা মাত্রই মা আর জ্যাঠাইমা খুট্‌খুট্‌ করে পুঁচকে দু’খানা টর্চ উঠোনের দিকে তাক করল। পিট্‌পিট্‌ করা টিউব আর টর্চের সম্মিলিত আলোয় বোঝা গেলো বাড়ির পুরনো লোক ভজুকাকা, মাটিতে চিৎপাত হয়ে হাত-পা ছুঁড়ছে। ওদের দেখতে পেয়ে উঠে বসার চেষ্টা করলেও সেটা নিছক ব্যর্থ হামাগুড়ি হয়ে দাঁড়ালো। মুখে কিম্ভূত শব্দে কিছু বলার চেষ্টা করছে, যেটা পিকলুরা কেউই বুঝে উঠতে পারছে না।

‘ভজুরে ভূতে পাইসে নাকি?’ জ্যাঠাইমা কাঁপা গলায় বললেন। ‘ঠাকুরপো, হেই থেইক্যা কইতাসি নিম গাসটা কাইট্যা ফালাও। শাগচুন্নি বাসা করে ওতে।’

‘তুমি রাইত-বিরেতে ত্যানাদের কথা কেন্‌ কও বৌদি?’, ছোট্‌কা ফোঁস করে উঠল। ছোটকা অকৃতদার এবং খুবই ভীতু প্রকৃতির মানুষ, দিনে রাতে কখনই অশরীরীদের নিয়ে আলোচনা করতে চান না।

‘ছোট, চন্দন কই?‘ বাবা ছোট্‌কাকে জিজ্ঞাসা করলেন। চন্দন পিকলুর জ্যাঠতুত দাদা, দিল্লীতে গাছ-গাছড়া নিয়ে রিসার্চ করে। আজকেই বাড়ি এসেছে পুজোর ছুটিতে।

‘ঘরেই আসে, চাদর চাইপ্যা ঘুমাইতাসে।’  

‘ভজুরে দাওয়া থেইক্যা না তুইলা এইখানে কি মিটিং করতাছোস?’ ঠাকুমা রেডিওটা বগলদাবা করে বেরিয়ে এসেছেন এতক্ষণে। আগামীকাল মহালয়া, উনি কিছুতেই ওটা আজকে হাতছাড়া করবেন না।

‘ছোট, ভজুর লগে যাতো। আমি রাইতের বেলায় ভালো চোখে দেখিনা,’ বাবা ক্রমাগত চশমা ঘসে নিমতলায় যাওয়া এড়ালেন। জ্যাঠামশাইয়ের ভরসা নেই, তিনি থামে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছেন আর থেকে-থেকে ‘কি অইলডা কি?’ বলে হেঁকে উঠছেন।

‘ভাইপো, আইসবা নাকি?’ ছোটকা নিরুপায় হয়ে পিকলুকে সাথী করল। সবাই জানে এ বাড়িতে দাদাভাইয়ের পরে ওর সাহসই সবথেকে ওপরের দিকে।

‘রমেন আজকাল ভজুকেও আফিম দিচ্ছে নাকি?’ পাশের বাড়ির রায় জেঠুর গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো। ‘বাঙ্গালের স্বভাব যত।’

পিকলুদের বাড়ির হইচইতে কাছেপিঠের অনেকের ঘরেই আলো জ্বলে উঠেছে। রায় জেঠু পুলিশে কাজ করতেন, খুচখাচ কিছু হলেই লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এখনও। দুই জেঠুতে একসময় গলায় গলায় ভাব ছিল। গাভাস্কার না পাতৌদি, কে বেশি বড় খেলোয়াড়, তাই নিয়ে ঝগড়া করে গত কয়েক বছর ওদের কথাবার্তা বন্ধ। দুই বাড়ির বাকিদের মধ্যে যদিও খুব ভাব। রায় জেঠুর মেয়ে ফুটুদি, ছোড়দির বেস্ট ফ্রেন্ড। পিকলুদের ফুটুদি খুব ভালোবাসে। ঠাকুমা আর ওর জন্যে আলাদা করে কুলের আচার বানিয়ে দেয়। ছোড়দি ওকে ‘বৌদি’ বলে ডাকলে খুব রেগে যায় কিন্তু আবার লজ্জায় লাল হয়ে দুটো কুল বেশীও দেয়।  

‘পেএএএত্‌ন্‌ন্‌নি…’

ভজুকাকার কাছাকাছি যাওয়ার পরে ওর কথা কিছুটা হলেও বুঝতে পারলো পিকলু। ও পাঁচিলের পাশের নিমগাছটার দিকে আঙ্গুল তুলে অদ্ভুত শব্দ করে যাচ্ছে। দাঁতকপাটি লেগেছে মনে হয়।

‘খাইসে! ডাকাইত!’

ছোট্‌কা কাউকে দেখে ভির্মি খেতে গিয়েও তুলসি মণ্ডপ ধরে নিজেকে সামলাল। পিকলু তো আনন্দে আত্মহারা, ডাকাত আর পেত্নী একসাথে হানা দিয়েছে ওদের বাড়িতে। জানলে ইস্কুলের সব্বাই হিংসে করবে ওকে। এদিকে ডাকাত শুনে রায় জেঠুও একলাফে দেওয়াল টপকে এপারে এসে হাজির। ওঁর হাতে বিরাট পাঁচ সেলের পুলিশি টর্চ আর পাকা বেতের লাঠি। এসেই মণ্ডপের পিছনে হাসনুহানার ঝোপে চালিয়ে দিলেন সপাং সপাং করে। চোর ডাকাতে ওনার ভয়ানক অ্যালার্জি। তবে এলেম আছে বলতে হবে। ঝোপের পিছন থেকে ঝুল মাখা একজনকে ঘাড় ধরে বের করে এনে অনায়াসে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলেন। মারের চোটে ছেলেটা ককিয়ে উঠতেই সবাই চমকে গেলো।

‘একি? চাঁদু তুই?’

রায় জেঠু অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর থাবায় আটকা পড়েছে পিকলুর দাদাভাই চন্দন।

‘ছোট যে কইল তুই ঘরে ঘুমাইতাছিস?’ বাবা এতক্ষণে সাহস পেয়ে নেমে এলেন আঙ্গিনাতে।

‘ও’টা কোলবালিশ,’ দাদাভাই পায়ে হাত বুলাতে-বুলাতে বলল। লাঠির ঘা খেয়েছে বেচারা ওখানে।

‘আমার বাগানের গোলাপ চুরি করেছিস ব্যাটাচ্ছেলে?’ রায় জেঠু বাঘের মতন গর্জালেন। পিকলু দেখল দাদাভাইয়ের হাতে একটা মাঝারি মাপের গোলাপ ফুল। রায় জেঠুর খুব সাধের গোলাপের বাগান আছে। সারাদিন পাহারা দেন। ফুল দেখেই চিনতে পেরেছেন।

দাদাভাই আমসি মুখে কিছু বলবে ভাবছিল কিন্তু একটা ‘মড়াৎ’ শব্দে সকলেই চমকে নিম গাছের দিকে তাকাল। উঠোনের টিউবটাও তক্ষুনি পাকাপাকি জ্বলে ওঠাতে পেত্নীর রহস্যেও আলোকপাত হল।

‘তুমি?’ ডাল ভেঙ্গে ধরাশায়ী ফুটুদিকে দেখে পিকলু তো থ।

দাদাভাই তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে ঝুল পাতা মাখা ফুটুদিকে হাত ধরে তুলে দাঁড় করাল। তারপরে মৃদুস্বরে ওর হয়ে সাফাই দিলো, ‘বটানি রিসার্চের কাজে লাগবে বলে ফুটু ফুলটা দিতে এসেছিল আমাকে। ভজুকাকাকে ভূত ভেবে ভয়ে গাছে উঠেছে।’

‘থাউক, শাগ দিয়া আর মাছ ঢাকোনের কাম নাই। আমাগো চোখে কি ন্যাবা?’ ঠাকুমা দাদাভাইকে ধাতানি দিয়ে মা, জ্যাঠাইমার উদ্দেশ্যে বললেন। ‘কাল শুভদিন আসে, আশীর্বাদটা সাইর‍্যা ফেলাও। ঘটির মাইয়া অইল তো কি অইসে, আচারটা বাইর‍্যা বানায়।’

‘কি পাগলি দ্যাখেন। রাতের বেলায় কেউ গাসে চড়ে? অমন চাঁদপনা মুখ, কাইট্যা, ছইড়্যা যায় নাই তো?’ জ্যাঠাইমা ছুটে গেলো নিমতলায়, ফুটুদির কাছে। সঙ্গে মা আর ছোড়দি। ছোড়দি মিচকি হেসে দাদাভাইয়ের হাতে দিলো রাম চিমটি।

এইসব কোলাহলের ভ্রান্তিতে আরেক কাণ্ড হল। প্রতিবেশী চক্কত্তিমশাই, দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেছে ভেবে, ছাদে এসে তারস্বরে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু বিষ্ণুমাযেতি শব্দিতা’ মন্ত্রজ্বপ শুরু করে দিলেন। রাত্তিরবেলার হইচই আর অকাল বোধনের আড়ম্বরে পিকলুও ততক্ষণে আনন্দে আত্মহারা। পুজোর ছুটিটা দারুণ কাটবে এ’বছর।।

শাস্তি


তোমাকে এত অস্থির দেখাচ্ছে কেন?’

হোটেলের বারান্দায়, চেয়ারে গা এলিয়ে রচনা পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি খেলা উপভোগ করছিল। অথচ, রঙ্গিত নদীর ধার ঘেঁসে উঠে যাওয়া সুউচ্চ হিমালয়ের নৈসর্গিক শোভা দেখে শান্তি পাওয়া দূরে থাক, অতনু আরও বেশি ধূমপান করছে। ওর মধ্যে সবসময় একটা চকিত, সন্ত্রস্ত ভাব। যেন, কারোর থেকে লুকিয়ে থাকতে চাইছে। জোরথাং ঘুরতে আসার পরিকল্পনাও আচমকাই ঠিক করেছিল অতনু। রচনা চায়নি ঝিলমিলের অযথা স্কুল কামাই হোক। তার চেয়ে বরং পুজোর ছুটিতে সিকিম ঘুরতে আসবে। ওর কোন আপত্তি কানে তোলে নি অতনু, বরং বাধা পেলে প্রচণ্ড অশান্তি করেছে। রচনা বুঝেছিল কোন অজ্ঞাত কারণে অতনু খুব মানসিক চাপে রয়েছে। অত্যন্ত চাপা স্বভাবের ছেলে সে। ওর কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়ার বৃথা প্রয়াস করেনি রচনা। শেষপর্যন্ত, ঝিলমিলের স্কুলে ছুটি নিয়ে জুলাই এর ঘোর বর্ষায় সবাই মিলে জোরথাং এ হাজির হয়েছে। অতিথি শূন্য হোটেলে ঘর সহজে পাওয়া গেলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাইরে পা দেওয়ার সুযোগ দেয়নি। গত দু’দিন অতনু হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করলেও এই মুহূর্তে সে অস্বাভাবিক রকম চঞ্চল।  

‘ও…এখানেও আমার পিছু ছাড়েনি!’

রচনা দেখল সিগারেট পুড়ে অতনুর আঙ্গুল ছুঁয়ে ফেলেছে। ওর ভ্রূক্ষেপও নেই। বিগত কয়েক মাসে লোকটা খুব দ্রুত বুড়িয়ে গেছে। স্বামীর গলায় সুস্পষ্ট উদ্বেগের ইঙ্গিতে অজানা আশঙ্কায় রচনা কেঁপে উঠল। অতনু কি কোন খারাপ লোকের খপ্পরে পড়েছে?

'কার কথা বলছ, অতনু?'

সিগারেটের শেষাংশ মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে অতনু রচনার পাশে এসে মাথা নিচু করে বসল। ওর মুখ ফ্যাকাশে। কাঁপা গলায় বলল, ‘ওকে দেখতে পাচ্ছ না? খুব রেগে তাকিয়ে আছে এই দিকে’।

‘কোথায় কে? এই হোটেলে আমরা ছাড়া আর কোনো গেস্ট নেই’, রচনা চারিদিকে আলগা চোখ বুলিয়ে বলল।

‘ঝিলমিলের পাশে যে মেয়েটা রয়েছে…একদৃষ্টিতে আমাকেই দেখছে’, অতনু যেন রচনার নেতিবাচক জবাবের জন্যে প্রস্তুতই ছিল।

‘ঝিলমিল তো একাই পাথর নিয়ে খেলছে সিঁড়ির কাছে। আমি সবসময় ওকে চোখে চোখেই রেখেছি’, রচনা অতনুর অমূলক ভয় ভাঙ্গার চেষ্টা করল। ছোট্ট ঝিলমিল একাই হাসছে, কথা বলছে। বাচ্চারা তো এমন করেই থাকে। হঠাৎ কাঁচের গ্লাসে মেয়ের প্রতিচ্ছায়া দেখে রচনার সারা গায়ে কাঁটা দিল। ঝিলমিলের শরীরের সাথে গা লাগিয়ে বসে আছে এক ধূসর অবয়ব। তার আকৃতি আবছা হলেও চোখ দুটি প্রকট। রচনা চমকে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেল না। এর কথাই কি অতনু বলে মাঝেমধ্যে ঘুমের ঘোরে?

‘জানিনা তুমি কি ভাবছ, কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি ওকে দেখতে পাই সবসময়। আয়নায় আমার প্রতিবিম্বের পিছনে ও নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গলে দেখি মাথার কাছে পলকহীন চোখে ও আমাকেই দেখেছে। চলন্ত বাসের পাদানি, ট্রেন স্টেশন, এমন কি ট্যাক্সির সামনের সিট থেকেও মাথা ঘুরিয়ে সারাক্ষণ আমার প্রতি ঘেন্না ঢেলে যাচ্ছে। আমার কোনো নিস্তার নেই রচনা। যার ভয়ে শহর ছেড়ে এতদূরে পালিয়ে এলাম… সে খুঁজে-খুঁজে এখানেও হাজির হয়েছে’, অতনুর গলা ধরে এল। রচনার হাত নিজের বুকে টেনে ধরে, ডুক্‌রে, শিশুর মতন কেঁদে উঠল সে। নিতান্ত অসহায় হয়ে আজ ও আশ্রয় চাইছে সহধর্মিণীর কাছে। এতদিনের অব্যক্ত আতঙ্ক অশ্রুর অঝোর ধারা হয়ে সিক্ত করে দিচ্ছে রচনার দুই হাত।  

প্রায় এক বছরের ওপর, অতনুকে ভিতর থেকে কিছু একটা কুরে-কুরে খাচ্ছে তা রচনা আন্দাজ করেছিল। নৈমিত্তিক ঝগড়া, কোন্দলে ওদের সম্পর্ক তলানি তে পৌঁছালেও শুধু ঝিলমিলের হাত ধরেই কোনমতে সংসার টিকে ছিল। তাই, মনের ভিতরে অদম্য কৌতূহল হলেও অতনুর ব্যক্তিস্বাধীনতার উঁচু পাঁচিল ডিঙ্গিয়ে তার কাছে যাওয়ার উদ্যম জোগাড় করে উঠতে পারেনি রচনা। সেই অক্ষমতার গ্লানি আর একসময়ের সবচেয়ে কাছের মানুষটার অনিষ্টের আশঙ্কা এখন ওকে বিহ্বল করে তুলল। অনুভব করল, একটা অদ্ভুত সুবাসে ওর ঘ্রাণেন্দ্রিয় অবশ হয়ে আসছে। জুঁই ফুলের মতন গন্ধটা খুব চেনা রচনার। মাঝরাতে অনেকসময় যখন অতনু চিৎকার করে উঠে বসে, তখন সারা ঘরে এর মাদকতা  ছেয়ে থাকে।

‘কবে থেকে এমন হল অতনু?’, থর্‌থর্‌ করে কাঁপতে থাকা স্বামীকে দুহাতে আঁকড়ে জানতে চাইল রচনা। আকাশছোঁয়া পাহাড়ের মাথায় জমে থাকা কালো মেঘ দ্রুতগতিতে উপত্যকায় গড়িয়ে অকাল সন্ধ্যে ডেকে এনেছে। বরফ শীতল কতগুলো ঘূর্ণি খোলা বারান্দায় পাক খেয়ে দুর্নিবার ক্রোধে ওদের চেয়ারের গায়ে আছড়ে পড়ছে। নিয়তি যেন অতনুকে রচনার বাহুপাশ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চায়।

‘পিকনিক থেকে ফেরার সময় অ্যাকসিডেন্টটা মনে আছে? নেশায় ছিলাম সকলেই। ফুটপাথে মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল ও’, অতনুর ফ্যাস্‌ফেসে গলায় আপসোসের গোঙ্গানি বমির মতন উঠে এল, ‘বাকি সবাই শেষ হয়ে গেছে। শুধু আমার শাস্তি বাকি রয়ে গেছে…’

মনে পড়ল রচনার, পিছনের সিটে ঝিলমিলকে বুকে চেপে আতঙ্কে চোখ বুজে থাকা। দুর্ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল সবাই। লুকনো অপরাধবোধ নিয়ে তারপরে সকলেই এদিক সেদিক আলাদা হয়ে গেছিল। কেউ ভুলেও খুঁজে দেখেনি সংবাদপত্রের এক কোণায় ছাপা খবরটা। কোলকাতায় ঘুরতে আসা পাহাড়ি মা মেয়ের অকাল প্রয়াণ মোমবাতির মিছিল তৈরির জন্যে যথেষ্ট ছিলনা।

রচনার ভাবনা খেই পাওয়ার আগেই একটা ভয়ানক হেঁচকা টান অতনুকে চেয়ার থেকে উপড়ে মেঝেতে ফেলে দিল। ওর শরীরটাকে বারান্দায় ঘষটাতে-ঘষটাতে কোন অদৃশ্য শক্তি নিয়ে গেল রেলিং এর কাছে। পাহাড়ের মাথায় প্রবল বর্ষণ বারান্দার ঠিক নিচ দিয়ে বহে যাওয়া রঙ্গিত নদিতে হড়কা বান এনেছে। ওখানে অতনু পড়ে গেলে ওর চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। রচনা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অতনুর গায়ের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারপাশের হিম-শীতল ঘূর্ণাবর্তগুলো একে একে জমাট বেঁধে ধোঁয়াটে, পুতিগন্ধময় চেহারা নিয়ে রচনার মুখের কাছে বীভৎস চিৎকার সহ রাগে ফেটে পড়ল। তার বিস্ফারিত চোখ আর বিকৃত অন্তহীন মুখ-গহ্বর রচনার সর্বাঙ্গ অবশ করলেও শরীরের শেষ বলটুকু একত্রিত করে সে অতনুর পা আর রেলিং জড়িয়ে থেকে নিশ্চিত মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখল। ঝিলমিলকে দেখতে পেল রচনা। খেলা বন্ধ করে, ঘাড় অস্বাভাবিক রকম ঘুরিয়ে জ্বলন্ত চোখে ঝিলমিল ওর দিকে নির্নিমেষে চেয়ে রয়েছে।

‘ঝিলমিল…!!!’, গলা চিরে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ বেরিয়ে এল রচনার। মূর্ছা যাওয়ার আগে কপালে ঝিলমিলের হাতের নরম পরশ পেয়েছিল রচনা, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে মা। ও বলেছে আমায়…’

******

নদীর গা ছুঁয়ে আসা ভেজা, ঠাণ্ডা হাওয়ায় কাঁপুনি দিল রচনার। রঙ্গিত আজকে শান্ত। নির্মেঘ সান্ধ্য আকাশ সূর্যাস্তের লালচে রঙ মেখে আছে এখনও। মাঝখানে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, তবু ভিতরের ক্ষতটা এখনও সবুজ। চোখ বুজলে সেদিনের ঘটনাগুলো ছবির মতন ভেসে এসে রচনার হুইল চেয়ারে আবদ্ধ শরীরে আতঙ্কের শিহরণ আনে। এই রেলিঙের পাশেই সেদিন অতনুর হার্ট ফেল করেছিল। রচনারও ব্রেনে ইন্টারনাল হেমারেজ হওয়ার জন্যে আংশিক পক্ষাঘাত হয়ে যায়। সেই অবস্থা থেকে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে মেয়েকে একা হাতেই বড় করেছে রচনা। পড়াশুনা শেষ করে ঝিলমিল মাকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাবে বলে ঝোলাঝুলি করলে রচনা নিজের থেকেই জোরথাং এর নাম বলে। বাবাকে ওর একেবারেই মনে নেই। সত্যি ঘটনা জানার মতন বয়স ঝিলমিলের হয়েছে ভেবেই রচনা ঠিক করেছে মেয়েকে সব খুলে বলবে। ওইতো সে, রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরায় ছবি তুলছে।

‘ঝিলমিল…একবার শুনবি মা’, রচনা শাল গায়ে জড়িয়ে মেয়েকে ডাকল। বেশ ঠাণ্ডা লাগছে, এবারে ঘরে গেলেই ভাল। একটা সুগন্ধে মনটাও আবার উতলা। এখানে জুঁই ফুল ফোটে নাকি?

সাড়া না পেয়ে আরেকবার ডাকল রচনা, ‘কিরে! শুনতে পারছিস না? আমাকে ভিতরে নিয়ে চল।‘

ঝিলমিল এবারে মুখ ফেরাল, সেই আগের মতন। রচনার মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল মেয়েকে দেখে। ঝিলমিলের মুখ শুকনো, ধূসর বর্ণের। বিকট আকৃতির চোখ দুটোতে সাদার লেশ মাত্র নেই। অসীম আতঙ্কে রচনা বুঝল, শাস্তি এখনও বাকি রয়ে গেছে।।

ভালোবাসার ভূত ভবিষ্যৎ

 


আরাম কেদারায় বসে টিভিতে খবর দেখতে দেখতে একটু ঝিমুনি এসেছিল রতন বাবুর। বয়স বাড়ার জন্যে এবং তার সাথে বিবিধ প্রকারের ওষুধের প্রভাবে সন্ধ্যে থেকেই ঘুম ঘুম পায় ওনার। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঘাড়ের কাছে একটা মোলায়েম হাতের স্পর্শ পেয়ে চটকটা ভাঙ্গলো।

“প্রেসারের ওষুধ আবার ভুলে গেছ আজকে?”, স্বপ্নাদেবী ভুরু কুঁচকে অনুযোগের সুরে বললেন। কপালে লাল টিপ আর গায়ে লাল পাড় সাদা জামদানী শাড়ি। মাথার খোঁপায় চাঁপা ফুল গোঁজা। ফুলের মিষ্টি গন্ধ এসে মন ভালো করে দিল রতন বাবুর। স্ত্রী, তাঁর ভালো লাগার কথা মনে রেখে, সুন্দর করে সেজে এসে দাঁড়িয়েছেন ওঁর পিছনে।

“এলে তাহলে”, রতন বাবু বাম হাত বাড়িয়ে স্ত্রীর হাতটা একটু ছুঁলেন, “আজকে এতো দেরি হল?”

স্বপ্নাদেবী পাশের চেয়ারে বসে রতন বাবুর গায়ে আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “কই আবার দেরি? সব কাজ ফেলে এলুম তো। তুমি কেন তোমার রোজকারের জিনিস সব ভুলে যাও? তোমার চিন্তায় আমার এখনও কিছু করার জো নেই” স্বপ্নাদেবীর কথায় চিন্তা আর অভিমান ঝড়ে পড়ল।

“আমি ভুললেই তো তুমি আস মনে করাতে। নইলে তোমার দেখা কি করে পাই?”, রতনবাবু হাল্কা হেসে উত্তর দিলেন। তারপরে, টেবিলে পড়ে থাকা চশমাটা তুলে চোখে লাগিয়ে নিলেন স্ত্রীকে ভালো করে দেখবেন বলে। প্রেসারের ওষুধ তিনি সত্যি ভুলে গেছেন ঘাড়ের কাছে শিরশিরানি অনুভূতি বুঝিয়ে দিচ্ছে রক্তচাপ বাড়ছে। একটু বাড়াবাড়ির দিকে গেলেই স্বপ্না দেবী ঠিক মনে করিয়ে দেন, কখন কোন ওষুধ খেতে হবে। তাঁর দীর্ঘ দিনের অভ্যেস এখনও যায়নি।

“মা... দাদুন আবার বকবক শুরু করেছে” ছোট্ট কস্তূরী লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকেই পিছনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে তার মা কে জানান দিল,“দাদুন নিশ্চয়ই আবার ওষুধ খায়নি

কস্তূরীর মিষ্টি আদর আদর গলায় শব্দগুলো শুনে প্রাণ জুরিয়ে গেলো রতনবাবুর। দুদিন আগেই এসেছিল ওরা কিন্তু এর মধ্যেই মনে হচ্ছে যেন এক যুগ পেরিয়ে গেছে।

“এই যে তোরা এসে গেছিস! এবার আমি সব খাব,” রতনবাবু সোৎসাহে আরাম কেদারা ছেড়ে উঠতে গিয়েও কোমরের ব্যাথায় আবার বসে পড়লেন। হাত বাড়িয়ে বললেন,“আয় দিদুন ঝপাং করে কোলে ঝাঁপা তো দেখি” কস্তূরী ওঁর মেয়ের ঘরের নাতনী। মা, মেয়ে দুজনেই স্বপ্নাদেবীর মুখের আদল পেয়েছে, হুবহু। রতনবাবু দেখলেন, স্বপ্না দেবীও গর্ব ভরা দৃষ্টিতে দেখছেন তাঁর দৌহিত্রীকে।

কস্তূরী রতনবাবুর কোল বেয়ে উঠে ঘাড় জড়িয়ে ধরে বলল,“দাদুন, তুমি দিদিনের ছবিতে মালা পড়াতে আবার ভুলে গেছ? সত্যি তোমার কিচ্ছু মনে থাকে না। আজকে না দিদিনের জন্মদিন!”

রতনবাবুর খেয়াল হল, উনি বেমালুম ভুলে গেছিলেন সব। সকালে কাজের মেয়ে সুলতাকে দিয়ে বাজার থেকে চাঁপা ফুলের মালা কিনিয়ে আনিয়েছিলেন সেটা স্বপ্না দেবীর ছবির সামনেই রাখা রয়েছে। আর রাখা রয়েছে স্বপনের দোকান থেকে ইস্তিরি করে আনা জামদানী শাড়িটাও।

“নাও, আমার সতিন এসে তোমাকে আমার কথা মনে করাল” স্বপ্নাদেবী পান চিবুনো ঠোঁট টিপে মৃদু হেসে বললেন,“নিজের একটু খেয়াল রেখ। এখনও অনেক কাজ বাকি তোমার এতো তাড়াহুড়ো করো না। বুঝলে?

রতনবাবু নাতনীকে বুকে চেপে ধরে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন, এবার থেকে সব নিয়ম মেনে চলবেন।।

গঙ্গারাম

 ভূমিকাঃ গঙ্গারাম গল্পটি লিখেছিলাম এপ্রিল ২০২০তে। রম্য রচনায় এটা আমার প্রথম প্রয়াস। আশা করি খুব একটা খারাপ লাগবে না। ছবি - আমার আঁকা।


মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ কি? তা এই প্রশ্নটি আমাকে না করে মোগল দের কোন ভায়রা ভাই কে করলে ভাল হত না কি? তাদের কাছেই এইসব কানাঘুষো খবর বেশি থাকে। এই যেমন আমি জোগাড় করেছি বিষ্টু মুকুজ্জের পাতাল প্রবেশের ‘বিকজ’। তেনাদের বিড়ির ব্যবসা ছিল একেবারে জমে ক্ষীর টাইপের। সকাল দুপুর বিষ্টু ভটভটিয়ে ঘুরে বেড়াত কলার তুলে। তারপর একদিন সব ফর্সা। কাক পক্ষীটিও টের পেল না বিষ্টু কই গেল। বিষ্টুর মা সবাইকে বলে বেড়ালো বিষ্টু নাকি হিল্লি দিল্লী ঘুরে বেড়াচ্ছে বিড়ির বিজনেসে। আমি শুনেই বুঝেছিলাম, শালা সব ঢপ। ওই বিড়ি মোটেই খেতে ভালো না, কেমন তিতকুটে সাদ, দাঁত টকে যায়। এরপর সেই দোলের দিন, বিষ্টুর ছোট শালির বর গোবরাটাকে দু’পাত্তর দিয়ে চেপে ধরতেই বাপু গলগল করে সব আউড়ে দিলেন। বিষ্টু নাকি বিড়ির মধ্যে পাতা পুরে বেচে কলাগাছ হয়েছে। হু হু বাপ, যেমন তেমন পাতা নয়কো, এক্কেবারে শিব ঠাকুরের ফেবারিট পাতা। শেয়ালদা ইষ্টিসনে রেল পুলিস খপ করে ধরে ঢুকিয়ে দিয়েছে ভিতরে। আর আমায় কি না দিল্লী দেখাচ্চে! বেশি বাড় বাড়লে পতন তো হবেই। ছিলি ভালো, আমতলার হাটে বস্তা পেতে বসতিস। সুখে থাকতে কি ভূতে কিলিয়েছিল যে সোজা শেয়ালদা যাবি? কেউ আমাকে বিষ্টু মুকুজ্জের পতনের কারণ জিজ্ঞাসা করেই দেখুক না, তিন ঘণ্টার কেলাস যদি না নিয়েছি তো আমার নাম গঙ্গারাম নয়। সেসব কাজের জিনিস পুছতাছ না করে মোগলদের হেনাতেনা এই সব নিয়ে মদনবাবু দিনের পর দিন ঘেমো হাতে অকারণে সক্কলকে বেতিয়ে বেড়িয়েছেন। না মানে সক্কলকে নয়। দু’একটা অখাদ্য, অমানুষ, বেয়াক্কেলে চ্যাংড়া, যারা দিন রাত এক করে ওই আকবর না বাবরের ঠিকুজি নিজেদের মাথায় ফুটো করে ঢোকানোর চেষ্টা করে গেছে, তাদেরকে বাদ দিয়ে, এই আমার মতন জোয়ান মদ্দ ছেলেদের।  

বলি পানিপথের মাঠ নিয়ে কার কার মধ্যে লোচা হয়েচিল সেটা জেনে কার বাবা বড়লোক হয়েছে শুনি? তাও সেটা নিয়ে এতো জিজ্ঞাসা। অথচ ও’পাড়ায় কাকপোতার ডোবা নিয়ে বাওয়ালটা কজনের মনে আছে সন্দেহ। কোথায় লাগে পানিপথ তার কাছে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজের মধ্যে দিন রাত্তির সেকি ফাটাফাটি। পেটো পড়ছে তো পড়ছেই। তুবড়িদা’র জমিয়ে কদর তখন। আজ লালের হয়ে নীলকে চমকাচ্ছে তো কাল সবুজের হয়ে হলুদকে। হাতের পেলাসটিকের ব্যাগ ভর্তি পেটো আর কোমরে দুই জোড়া ওস্তাদ নিয়ে তুবড়িদা কাকপোতার ডোবায় মাটি ফেলত। আমি একবার বলতে গেছিলুম, পেলাসটিক ব্যভারটা ঠিক নয়। এনভাওরনের ক্ষতি করে। আমাকে দু’লাথি দিয়ে তাড়িয়ে দিলে। কিন্তু ওপরওয়ালা এই অবিচার ঠিক লক্ষ করেছেন। কাকপোতার কত নম্বর যুদ্ধে জানি না, পেলাসটিক ছিঁড়ে পেটোগুলো পড়ল তুবড়িদা’র পায়ের কাছে। মার এখন কাকে লাথি মারবি? অকারণে এতো লড়াই করলে পতন হবে না? গান্ধিজি বলে যায়নি? পেটোর বদলে পেটো মারলে একদিন কারোর কাছে পেটো রইবে না। রংবাহারের দল মাথা ঠাণ্ডা রেখেছিল বলেই না আজকে কেমন রামধনু রঙের আখাম্বা বাড়িগুলো হয়েছে কাকপোতায়। এতো হেজিয়ে পেজিয়ে পাতার পর পাতা বই পড়ার পরে মোদ্দা কথা হল, অকারণে পাঙ্গা নিস না। সেটা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেই বলে দিতুম, বেকার বেকার মদনবাবুকে কেলাসে বসে লাঠি ঘোরাতে হত না।

শুধু কি এই? মোগল হোদলাগুলো তিরিশ চল্লিশটা করে রানি পুষেছে ঘরের মধ্যে। আমি ভাবি, পাগল না পেঁয়াজি? দিলুর বাপ রোজ হালকা নেশা করে বাড়ি ঢুকে একটি বউয়ের কাছেই আগাগোড়া ঝাঁটা পেটা খায়। তারপরে বাইরে বসে মন খারাপ মার্কা হেচকি তোলে। কত বড় লোক সে। বিরিজের তলায় একটা চোলাই ঠেক চালায়। মেলা কাজ। কি টেনসন আর কি টেনসন। মানুষের লাইপ নিয়ে খেলা যাকে বলে, কিন্তু কোনো সম্মান নেই ঘরে। আমি একবার তার শুঁড়ির কারখানায় উঁকি মেরে দেখতে গিয়ে একটা ফেনলের শিশি উলটে দিয়েছিলুম হাঁড়িতে। কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ কেটে পড়েছিলুম বাবা সেখান থেকে। ফেনলের জন্যে যদি দু’টাকা চেয়ে বসে? পরের দিন শুনি পোঁদপাড়ার লোকেরা এসে বেদম ঠেঙিয়েছে দিলুর বাপকে। চোলাই খেয়ে কটা বুড়ো খুশির চোটে অক্কা পেয়েছে। লাইপ অ্যান ডেথ ব্যাপার নাতো কি? এ’রকম টেনসনে থাকলে দেখতাম সেলিম কেমন ফুল নিয়ে দৌড়ায় আনারকলির পিছনে। আর ওই রকম উদমা মুড়ো ঝাঁটায় সপাং সপাং খাওয়ার পর কোন পুরুষ মানুষের তাজ হোটেলে বউকে ফিসটি দেওয়ার সখ বেঁচে থাকে? সেই দুঃখেই তো শাজান স্যার কেঁদে কেটে মরে গেল। ইস্কুলের নাটকে দেখেছি। হেব্বি হাততালি পড়েছিল। দিলুর বাপের চোখে জল চলে এসেছিল আমি দিব্যি কেটে বলতে পারি। 

বিয়ে আমার এখনও হয়নি বটে কিন্তু ব্যাটাছেলের দুঃখ আমি ঠিক বুঝি। আক্কাস গাজির চার নম্বর নিকা তে গিয়ে আমি ওর কানে কানে বলেছিলুম, এতো কচি বউ, পালাবে কিন্তু। ওমা সেকি রাগ! দাঙ্গা প্রায় বাঁধে বাঁধে। মাস ছ’য়েকের মধ্যে চার বউতে এমন চুলোচুলি করলো যে আক্কাস গাজি নিজেই পালিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। অদ্ধেক হলেও আমার কথা ফলল তো?  ভেবে দেখ, চারেতেই আক্কাস গাজির মতন পালোয়ানের যদি এই হাল হয়, তালে ওই মোগলের ব্যাটারা চল্লিশ বউ নিয়ে আছাড় খাবে না? পতনের কারণ কি এর পরেও চোখে আঙ্গুল দিয়ে বলে দিতে হবে? 

তাও জিজ্ঞেস যখন করেইছ আমিও উত্তর না দিয়ে যাবই না। উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েই ছাড়ব। ওমা, দেখচি কলমে কালিই নেই। সামনের ছোঁড়াটার জামায় নিব লাগিয়ে বসে ছিলাম। সব কালি এখন ওর পিঠে।  পাশের ঘণ্টু কি এতো লিখছে কে জানে। অনেক চাইতেও হারামজাদা কলম ধার দিল না। মন বড় না হলে কোনোদিন নম্বর পাবে না হতভাগা, বলে দিলাম আমি। কিন্তু এ আবার কি? এই লোকটা আমার খাতা নিয়ে যাচ্ছে কেন?

“পিসেমশাই, থুড়ি মাস্টারমশাই, আমার খাতা দিয়ে দিন বলছি! একটা কোয়েসচেন কমন পেয়েছি অনেক বছর পর। লিখেই বেরিয়ে যাব।”

আমার কথা কানেই তুললে না? আস্পদ্দা কম নয় বুড়োর। গলাটা চড়াতে হবে এইবার।

“পিসেমশাই…”, মোলো যা। খালি পিসোকে নিয়ে টানাটানি কেন করছি কে জানে। “মাস্টারমশাই  আমার খাতা…”

এইও আরও লোক নিয়ে আসছে কেন রে বাবা? দাঁড়া ঝোলা থেকে বের করছি পেটোগুলো। 

মধ্যশিক্ষা পর্ষদ থেকে জানা গেছে যে মাধ্যমিক পরিক্ষা নির্বিঘ্নে হয়েছে। কেবল একটি জায়গার খবর পাওয়া যাচ্ছে না। উপগ্রহ থেকে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা চলছে। বিস্তারিত খবরে পরে আসছি…