রবিবার, ২১ আগস্ট, ২০২২

বই হিমযুগ, গল্প স্কেচবুক - টিজার

বাড়িওয়ালা গোলোকনাথ বসু একজোড়া স্কেচবুক কিনে তার থেকে একটা উপহার দেন অর্ণবকে। অর্ণব ভালো ছবি আঁকে, তাই তাকে উপহার দিয়েছেন গোলোকবাবু। আর এই স্কেচবুকের আগমনে বদলে যেতে থাকে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের জীবন। কীভাবে? পড়ুন আমার একক সংকলন ‘হিমযুগ’-এ ‘স্কেচবুক’ গল্পে। 

অলংকরণ: দিলীপ দাস

শুক্রবার, ১৯ আগস্ট, ২০২২

বই হিমযুগ, গল্প মোবট


হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে নিজেকে একটা শূন্যে ভাসমান স্লিপিং পডের ভিতর আবিষ্কার করে বিতনু। চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পায়, ও পৌঁছে গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে। বদলে গেছে চেহারা এবং পোশাকও। ওর কৌতূহল নিরসনে এগিয়ে আসেন এজে। তার পর তিনি এমন সব কথা বলেন, যা শুনে চমকের পর চমক লাগে বিতনুর।


কী এমন ঘটনা, যেগুলো শুনে চমকে উঠতে হয় বিতনুকে? এই এজে ভদ্রলোক আসলে কে, কী তাঁর পরিচয়? কোন ভয়ংকর সত্যি অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য গল্পের শেষে?


সব উত্তর পেতে পড়তে হবে আমার সায়েন্স ফ্যান্টাসি সংকলন ‘হিমযুগ’। গল্পের নাম ’মোবট’। প্রকাশিত হবে পুজোর আগেই।


সঙ্গের ছবি: উজ্জ্বল ধর
হিমযুগ: সিদ্ধার্থ পাল
এবারত প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: উজ্জ্বল ধর
অলংকরণ: দিলীপ দাস ও উজ্জ্বল ধর

বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০২২

বই হিমযুগ, গল্প হোয়াট ইফ

 


এজেন্সি ফর অ্যাবনর্মাল কেস স্টাডিজ— ভারত সরকারের আভ্যন্তরীন নিরাপত্তা বিভাগের একটি গোপন শাখা। যাদের কাজ হলো অদ্ভুত, অলৌকিক সব ঘটনার তদন্ত করা। এই ডিপার্টমেন্টের তরুণ অফিসার খোঁজ পায় এক আশ্চর্য বালকের; সুজাতা দেশমুখের ছেলে বাবুল দেশমুখ। যার আঁকা ছবির দৃশ্যগুলো ভবিষ্যতে বাস্তব রূপ নেয়। সত্যিই কি তাই? তদন্তে নেমে কী জানতে পারে আসিফ? গত কয়েক সপ্তাহের রেড অ্যালার্ট কোন ঘটনার বিপদ সংকেত?


উত্তর আসছে ‘হোয়াট ইফ’ গল্পে; আমার একক সায়েন্স ফ্যান্টাসি সংকলন ‘হিমযুগ’-এর পাতায়। বই আসবে পুজোর আগেই।
হিমযুগ: সিদ্ধার্থ পাল
এবারত প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: উজ্জ্বল ধর
অলংকরণ: দিলীপ দাস ও উজ্জ্বল ধর
সঙ্গের ছবি দিলীপ দাস।

সোমবার, ১৫ আগস্ট, ২০২২

বই হিমযুগ, গল্প এনসেলাডাস- টিজার

 

স্পেস ট্যুরিজম কোম্পানি ইনফিনিট হরাইজন টেন্ডার পেয়েছে শনি গ্রহের ষষ্ঠ উপগ্রহ এনসেলাডাসকে মনুষ্য বসবাসের উপযোগী করে তাতে পর্যটন ব্যবসা করার। প্রতি তিনটি রোবোটিক মিশনের পর একটি হিউম্যান মিশন— এই ফরম্যাট মেনে এবার এক বঙ্গ সন্তান লোচন এসেছে এনসেলাডাসে। সে কি পারল শনির হিমায়িত উপগ্রহটিকে পর্যটন ব্যবসার উপযোগী করে তুলতে? কোথায় গেল তার আগের অভিযাত্রী অ্যানা মারিয়া? যার সঙ্গে মিলেই কাজ করার কথা লোচনের। অ্যানার হ্যাবিটাট রোজ একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে কেন? সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে পারবে কি লোচন সফল হতে?


আসছে আমার প্রথম একক সংকলন হিমযুগ; দু’টি নভেলা ও তেরোটি সায়েন্স ফ্যান্টাসি গল্প নিয়ে।
প্রকাশক: এবারত প্রকাশনী।
অলংকরণ: দিলীপ দাস ও উজ্জ্বল ধর।
প্রচ্ছদ: উজ্জ্বল ধর।
প্রকাশিত হবে পুজোর আগেই।




সোমবার, ৩০ আগস্ট, ২০২১

গাহিজি-র কবিতা

 খাতাটা নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল গাহিজি। ছন্দ মিলছে না, ভাবও আসছে না। একসময় বিড়বিড় করেই বানিয়ে ফেলতে পারত মনে-মনে কত কি। আজকাল শুকিয়ে যাচ্ছে কবিতাগুলো। এরচে’ সূর্যাস্ত দেখা


ঢের ভালো। হতাশ হয়ে জিপের বনেটের ওপরে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল সে। এক আকাশ ভরা পাখির দল বাড়ির পথে ঝাঁক বেঁধে শেষ কয়েকবারের ঘুরপাক খেয়ে নিচ্ছে। লাল গোল্লাটা ভিরুঙ্গা পাহাড়ের মাথার কাছে খানিকক্ষণ দম নিয়ে অপেক্ষা করছে ঝুপ করে হারিয়ে যাওয়ার আগে। ওখানে আছে বিরাট লেক বুরেরা। ছেঁড়া-ছেঁড়া কিছু ছবি ভেসে এলো গাহিজি-র মনে। মা বলত, ওই হ্রদের জলেই নাকি রাতে গা ডুবিয়ে থাকে সূর্য। দিদি মানতে চাইত না। রুসুমু-তে মাসির বাড়ি ঘুরতে গিয়ে লেকের পাশে গোটা বিকেল কাটিয়েও সূয্যিমামার জলকেলির কোনও প্রমাণ পায়নি ও। বরং তার ধারণা ছিল সূর্যটা নিশ্চয়ই ভিরুঙ্গা-র আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে গিয়ে লুকোয়। এদিকে গাহিজি-র পছন্দ লেক। সুতরাং তর্কবিতর্ক, চুল টানাটানি শুরু হয়ে যেত দুই ভাইবোনের মাঝে। মা হয়রান হয়ে শেষমেশ ভয় দেখাত, বাবা ফিরলেই নালিশ করে দেবে। ওতে কাজ হত ম্যাজিকের মতন। দুজনেই গুটিসুটি মেরে এক কোণায় গিয়ে বসে থাকত। বাবা-কে তখন খুব ভয় পেত গাহিজি। রাগও হত। যত পুতুল খেলনা সব দিদির। গাহিজি-র জন্যে শুধু একটা কবিতা লেখার খাতা। এখন মনে হয়, ভাগ্যিস।

“ওঠ শালা। খালি শুয়ে থাকলে একদিন হাড় মজ্জা সব জমে যাবে,” মুখ খারাপ করতে-করতে গাহিজি-র পায়ে সপাটে লাথি মারল মুগিশা। নেশায় টলছে বুড়োটা। সারা গায়ে রক্তের ছিটে।

“দিলে ত’ বারোটা বাজিয়ে…,“ বিরক্ত হয়ে বলল গাহিজি। টুকরো-টুকরো স্মৃতিগুলো যখনই জোড়া দিতে বসে ও, তখনই মুগিশা এসে জ্ঞান জাহির করা শুরু করে। শুয়ে থেকেও আর শান্তি নেই। বাতাস পশ্চিমে বইছে। কালো ধোঁয়ার পাক খাওয়া মেঘ সূর্যাস্তের মেজাজ নষ্ট করে দিয়েছে। সঙ্গে একটা মাংস ঝলসানোর গন্ধও আসছে। গেল রবিবার ক্যাম্পে ইমবোগো, মানে মোষের মাংস পোড়ান হয়েছিল। অনেকটা সেই রকম। ও কান পেতে রইল কিছুক্ষণ। চিল্লাচিল্লি আর শোনা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে ভেসে আসা চাপা র‍্যাট্‌-ট্যাট্‌-ট্যাট্‌ শব্দগুলো হঠাৎ শুনলে মনে হবে যেন এক অজানা কাঠঠোকরার ব্যস্ততা। আসলে ওগুলো মেশিনগানের আওয়াজ। এথনিক ক্লিন্সিং সোজা ব্যাপার নয়।

“ভুলে যাস না যে তুই উমুতুতসি। তোর বাবা বিকিজা বিরাট লিডার ছিল। সেই জায়গা নেওয়ার আগে তোকে মরদ হতে হবে। কি সারাক্ষণ কবিতা-কবিতা করিস?” গাহিজি-র মাথায় বন্দুকের বাঁট দিয়ে খোঁচা মেরে বলল মুগিশা। ছেলেটাকে তাগাদা দিয়ে-দিয়ে সে ক্লান্ত। বিকিজা-র মত ওর চোখেও আগুন আছে। বছর পাঁচেক আগে কারাম্বোর জঙ্গল থেকে বন্ধুপুত্রটিকে উদ্ধার করেছিল সে। তখন থেকেই আশায় বুক বেঁধে রয়েছে। বদলার আশা। কিন্তু ওর এসবে উৎসাহই নেই। ছোকরার এতো ভালো নিশানা বন্দুকে, অথচ হরিণ, বাইসন মারা ছাড়া আর কোনও কাজে লাগল না। বাকিরা যখন চপারের গায়ে লেগে থাকা রক্ত মুছতে নিবিষ্ট, তখন সে কিনা পোড়া ঘরগুলোর ভিতরে বই খুঁজছে! অদ্ভুত সব আচরণ। আজ যেমন গেলই না সঙ্গে। যাকগে, ন্যামোগালি-র শহরতলিতে এই মরাং গ্রামটায় কাজ মোটামুটি সেরে এনেছে মুগিশা-র গ্যাং। এখানকার বাসিন্দারা সবাই ছিল হুতু উপজাতির। তাই কোপানোর আগে ঝাড়াই বাছাই বিশেষ করতে হয়নি তাকে। এরকম আরও দুটো গ্রাম জ্বালাতে পারলেই এক পক্ষকালের কোটা পূরণ হয়ে যাবে। পদোন্নতি হবে মুগিশা-র।

অটোমেটিক রাইফেলটাকে পেটের ওপর থেকে সরিয়ে উঠে বসল গাহিজি। কষ্টিপাথরের গায়ে খোদাই করে বানানো মূর্তির ন্যায় পেশীবহুল সুঠাম শরীরে পিছলে পড়ল লাল সূর্যের আলো। মুগিশা বলে, একদিন সে অনেক বড় হবে। বন্দুক আর কলম দুটোতেই যে সে দক্ষ। যোগ্য নেতা হওয়ার সুলক্ষন নাকি সেগুলো। সত্যি মিথ্যে বোঝে না গাহিজি। ভাবতে ভালোই লাগে। ন্যামোগালি থেকে আরম্ভ করে দেশের রাজধানী কিগালি পর্যন্ত সকলেই বেশ ওকে এক নামে চিনবে। তবে আতঙ্কে নয়, ভালোবাসায়। মুগিশা মানতে চায় না। কানের কাছে অনবরত ভনভন করে মনে করাতে থাকে রুয়ান্ডার গণহত্যার কথা। গুনে গুনে একশ দিন ধরে চলেছিল। শয়ে নয়, হাজারে নয়, লাখে লাখে তুতসি-দের পোকা মাকড়ের মত খুন করেছিল হুতু-রা। প্রতিশোধ নিতে চায় তাই মুগিশা। বুনো কুকুরের মত দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায়, গ্রাম থেকে গ্রামে, হুতু-দের খোঁজে। মৃত্যুর পরোয়ানায় ছেলে, মেয়ে, বুড়ো, শিশু কারোর ছাড় নেই। মুশকিল হয়েছে শুধু গাহিজি-র। কবিতার ছন্দ আর সে মিলিয়ে উঠতে পারছে না।

“যাহ্‌, এখনও জান বাকি আছে শালির। মজা লুটে নে,” ফস করে সিগারেট ধরিয়ে এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল মুগিশা। হাতের ইশারায় দেখাল কাঁচা রাস্তার ওপাশে দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমির দিকে।

“নাহ্‌! আমার ভালো লাগছে না,” অস্ফুটে বলল গাহিজি।

“তবে রে!” এক লাফে ঘাড়ের কাছে এসে কবিতার খাতাটা কেড়ে নিল মুগিশা। চোখ লাল করে বলল, “সবসময় কোঁচড়ে নিয়ে ঘুরিস তুই। নে, জ্বালিয়ে দিলাম। না গেলে ঘিলু উড়িয়ে দেব এরপর।“

জ্বলে ওঠা কাগজগুলোর দিকে ভাবলেশহীন হয়ে চেয়ে রইল গাহিজি। শেষ স্মৃতিটাও গেল। ওর ঘাড় ধরে ঠেলতে-ঠেলতে মুগিশা নিয়ে গেল ঘাস বনের দিকে। আজ ওকে মানুষ করেই ছাড়বে সে। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।

“প্যান্ট খোল… কীরে? ভাবছিসটা কী? এখনও বেঁচে আছে। মাইরি বলছি।”

মাটিতে শুইয়ে রাখা তালগোল পাকানো শরীরটার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল গাহিজি। ওকে ধাক্কাধাক্কি করতে লাগল দলের বাকি জন্তুরা। গাহিজি ভাবল, এই জিনিসটা জ্যান্ত? সত্যি? হ্যাঁ ওই ত’, কণ্ঠনালীর কাছে রক্তের বুদ্বুদ হচ্ছে একটু পরে পরে। মানে শ্বাস চলছে। ওইটুকুই। অবশিষ্ট রক্তস্নাত অবয়বটায় পোশাক বা প্রাণের আর কোনও চিহ্ন নেই। তবে মেয়েটার ঘোলাটে দৃষ্টিতে ভয় কোথায়? বরং একরাশ ঘেন্না নিয়ে চোখদুটো দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে। হতভাগ্য দেহটার মায়া কাটিয়ে যেন অন্য এক জগতে ইতিমধ্যেই চলে গেছে তার মন। মার্সি কিলিংয়ে পুণ্যি হয়? গাহিজি-র যে অনেক পুণ্যির দরকার।

তাকে কিছু করতে হল না। রক্তের বুদ্বুদ নিভে গেল আপনা থেকেই। মরেও শান্তি আছে নাকি? মুগিশার সাঙ্গোপাঙ্গরা মেশেটি নিয়ে দেহাংশের সুভেনির সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। গাহিজি এক দৃষ্টে চেয়ে রইল নিঃস্পন্দ অভাগিনির চোখের দিকে। যে দিকে তাকিয়ে ছিল সে মুগিশাও পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকেই। সাভানা গ্রাসল্যান্ডে হারিয়ে গেলে কাউকে খুঁজে পাওয়া নাকি বেশ শক্ত। মোটেই তা নয়। সোনালী ঘাসে রক্তের দাগ অনুসরণ করলেই হয়। পিছু নিল গাহিজিও। একটু পরে দেখতে পেল সামান্য খোলা জায়গা। সেখানে মুগিশা সহ ওদের দলের আরও দুজন কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে। ওদের সামনে জড়সড় হয়ে রয়েছে দুটো পুঁচকে ছেলে মেয়ে। মেয়েটা একটু বড় ছেলেটার চে’। দিদি হবে হয়তো। ভাইকে আগলে রেখেছে বুকের মধ্যে। সহোদরটিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব মা তাকে দিয়ে গেছে।

অবসন্ন হয়ে গেল গাহিজির শরীর। ছেঁড়া স্মৃতিগুলো আবার জমাট বাঁধছে মাথার ভিতরে। পাঁচ বছর আগে এমনই কিছু ঘটেছিল না? একটা ভয়ানক ঝড়ের রাত। তারপরে ছত্রখান হয়ে গেছিল ছোট্ট সংসারটা। মনে পড়ল, দরজায় হিংস্র করাঘাতের শব্দ। বাবা পিছনের দরজা দিয়ে বের করে দিয়েছিল ওদেরকে। বলেছিল, “প্রতিবেশীই ত’। কথা বলে ঠিক সামলে নেব। সাবধানের মার নেই, তাই তোমরা লুকাও।“ ভাইবোন মায়ের পিছু-পিছু এসে লুকিয়েছিল ভাঙ্গা ইউক্যালিপটাস গুঁড়ির আড়ালে। বাবা ঠিক আসবে ফেরত নিতে। কিন্তু প্রহর কেটে যেতেও বাবার দেখা না পেয়ে মা গ্রামে গেল খুঁজতে। আর আসেনি। একটা গোটা দিন আর গোটা রাত ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরেছিল দিদিটা। তারপরে খুব তেষ্টা পেয়েছিল গাহিজির। দিদিকে বলেছিল, “জল খাব।“

“আনছি। তুই বসে থাক এখানে। এক পাও নড়াবি না,“ দিদি গেল জলের খোঁজে। কবিতার খাতা বুকে আঁকড়ে এখনও অপেক্ষায় রয়েছে সেই ভাই।

“এই নে। হাত শুদ্ধি কর,” গাহিজির হাতে মেশেটি তুলে দিয়ে বলল মুগিশা। “এদের জন্যে বেকার গুলি নষ্ট করিস না।“

“উমুতয়ারে মুগিশা, মেয়েটাকে…,” লোভে চকচক করে ওঠা চোখে দলপতিকে বলল কারাঞ্জা। শিকারকে সহজে মারলে সাধ মেটে না তার। এই নেশা ড্রাগের চেয়েও ভয়ংকর। গাহিজি জানে। তাই আর দেরী করল না সে। মেশেটির প্রচণ্ড কোপ বসাল কারাঞ্জার ঘাড়ে। ভারী মাথাটা ঘাস ছোঁয়ার আগেই আবার হাত চলল তার। কাটা কলাগাছের মত গড়িয়ে পড়ল আরেকজনও।

“খবর্দার গাহিজি…,” মুগিশার মুখের কথা শেষ না হতেই তার বন্দুক ধরা কব্জিটা হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে লুটালো।

ডান হাতে মেশেটি আর বাম হাতে উদ্যত কালাশনিকভ, গাহিজির এমন রুদ্ররূপ আগে কখনও দেখেনি কেউ। ছটফট করতে থাকা মুগিশা-কে কুড়িয়ে নিয়ে কোনও মতে রণে ভঙ্গ দিল বাকিরা। বাচ্চা দুটোকে জিপে বসিয়ে ধুলো উড়িয়ে রওনা দিল গাহিজি। মাইল দশেক দূরে ইউনাইটেড নেশন্সের ক্যাম্প। অনেক বড় পুরস্কার রয়েছে ওর মাথায়। সারেন্ডার করলে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াতে হতে পারে। যা হবে দেখা যাবে। আপাতত দারুণ আনন্দ হচ্ছে গাহিজির। প্রাণ বাঁচানোর মাদকটা যে আরও অনেক স্ট্রং। পুরো মাতাল করে দেয়। শুকনো ছন্দের খাতে ছুটিয়ে দেয় ফল্গুধারা। বিড়বিড় করে আবৃত্তি করতে থাকলো সে আজ অনেকদিন পরে-

“একলা ভীষণ। অন্ধকারে যোগ বিয়োগের ভুলে,

পাতার মাঝে, বনের খাঁজে সূর্যের শীতলতা-

হারিয়ে ফেলা স্নেহের মুঠো, স্বপ্নের ফাঁকে ছুঁলে,

রক্তজবার পাপড়ির কানে ফিসফিস বারতা-

আমি বেঁচে আছি…”

শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

দুই কাহন


বকুলদি আসছে না ক’দিন। রান্না কিছুই নেই ফ্রিজে। কালকে ভাত তরকারি অতিরিক্ত রয়ে গেছিল। কিন্তু টিফিন-বক্স খুলে গন্ধ শুঁকে রেখে দিল তিতির। টকে গেছে। ফ্রিজটা ঠিক মতন কাজ করছে না। এক গামলা দুধ নষ্ট হয়েছে দু’দিন আগে। তবে গরম যা পড়েছে, ফ্রিজ বেচারা কিই বা করবে। সময়, রাত পৌনে বারোটা। তিতিরের আলসেমি লাগল ঘড়ি দেখে। ঠিক করল, ম্যাগি দিয়ে আজকের ডিনারটা সেরে নেবে। সেইমতন রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিল, তখনই মোবাইল বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। উটকো উপদ্রব হবে খুব সম্ভবত। মরুকগে যাক। ও ফোন রেখে দিল ডাইনিং টেবিলে।

তিতির দু’মিনিটের বেশি সময় নিয়েই ম্যাগি বানাল সসপ্যানে। ও’দিকে কাঠের ওপর মুঠোফোন ক্রমাগত ভাইব্রেশন করে যাচ্ছে। কেউ জরুরী প্রয়োজনে বারবার ওকে খুঁজছে। তিতির সাম্ভাব্য কলার-দের অনুমান করার চেষ্টা করল। রাজীবদা নয়, কারণ পুরনো অফিসের পাট চুকেবুকে গেছে অনেকদিন। বাড়িতেও সে তেজ্যকন্যা। তাহলে হয় নতুন চাকরীর আহ্বান অথবা বিয়ে। নওক্‌রি এবং শাদি, দুটো ডট কমেই পার্সোনাল নম্বর দেওয়া আছে। কিন্তু এত রাতে?

“হ্যালো! হু ইজ দিস?”

তিতির প্রশ্নটা করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। ফোনের ওপারে কেউ একজন আছে। নড়াচড়ার শব্দ আসছে অথচ কথা বলছে না। তিতির বারদুয়েক “হ্যালো” বলার পরে ফোন কাটতে যাচ্ছিল, সেই মুহূর্তে ও’পাশ থেকে ঘড়ঘড়ে পুরুষ কণ্ঠে কেউ বলল, “হ্যালো, মিতা?”

“রঙ নাম্বার।“

শাল্লা, মাঝ রাত্তিরে কে আবার মিতা-কে খুঁজছে। মোবাইল রেখে ম্যাগির ঝোলে চুমুক দিয়ে একচোট হেসে নিল তিতির। লোকটার গলা শুনেই মনে হয় নেশারু।

“গড সেভ বেচারি মিতা… খ্যাঁক-খ্যাঁক!”

হাসি শেষ হতেই খিদেটাও দুম করে হারিয়ে গেল। উদ্ভট শুঁটকো গন্ধ আসছে নুডল্‌সের পাত্র থেকে। খাওয়া যাবে না। যদিও তাতে ক্ষতি বিশেষ নেই। কাঁচের বাহারি চামচটা বাটিতে অর্ধেক ডুবিয়ে গোটা চারেক ছবি তুলে নিল। সঠিক ফিল্টার লাগিয়ে ইন্সটা-তে দিলে এক বালতি লাইক চলে আসবে। ওতে পেট না ভরলেও মন ভরে। কারিকুরি শুরু করতে না করতেই বোঁ-বোঁ আওয়াজে নতুন মেসেজ ঢুকল।

“মিতা, ম্যাগির প্যাকেটগুলো পুরনো। এবারে ফেলে দাও।“

অবাক হল তিতির। মিলিয়ে দেখল, লাস্ট ইনকামিং কল আর এই মেসেজ প্রেরকের নম্বর আলাদা। অথচ দুজনেই মিতা-কে সম্ভাষণ করছে। একই ব্যক্তি সিম কার্ড বদলে চালাকি করছে নির্ঘাত। কিন্তু ম্যাগির বিষয়ে জানল কীভাবে? দ্রুত চারিদিকে তাকাল ও। বেডরুমে এসি লাগানো তাই ঘরের জানালা সব বন্ধই রয়েছে। সুতরাং বাইরে থেকে ওর ওপরে নজর রাখা সম্ভব নয়। পরিচিত কেউ কৌতুক করছে না ত’? আবীরের সঙ্গে ব্রেক-আপটা সমঝোতা করে হয়নি। ফোন করে শাসিয়েছিল সে কবার। হয়তো শয়তানিটা ওরই।

চোখের পাতা ভারী হয়ে আসলেও তিতির রিমোট নিয়ে সোফায় বসল। মুভি সার্ফিং অনেকসময় ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসির কাজ করে। কিন্তু আজ টিভি অন হতেই ঘুম চটে গেল। নেটফ্লিক্সের লগ-ইন স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে প্রোফাইল নেম “মিতা”।

তিতিরের কাছে ব্যাপারটা আর ইয়ার্কি নয়। কেউ ওর ঘরে ঢুকে টিভ-র সেটিং বদলে দিয়েছে ভাবলেই গা শিরশিরিয়ে উঠছে। কে জানে আর কী করে গেছে বদমাশটা। গোপন ক্যামেরা লাগায়নি ত’ কোথাও? হঠাৎ নিজেকে ভীষণ অরক্ষিত মনে হল তিতিরের। সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে পাগলের মতন খোঁজাখুঁজি আরম্ভ করল দু’কামরার ঘরটায়। ঘুলঘুলি, বইয়ের তাক, টিউব লাইটের পিছন থেকে শুরু করে সিলিং ফ্যান, এসি, জানালা, দরজা কিছুই বাদ রাখল না সে। আধঘণ্টা পরে ঘর্মাক্ত কলেবরে তিতির এসে বসল ডাইনিং টেবিলের পাশের চেয়ারে। সন্দেহজনক কিচ্ছু নেই। শুধু মোবাইলে নতুন টেক্সট বলছে, “কিছু খুঁজছ? হাঁপিয়ে গেলে বড্ড।“

“হু দ্য হেল আর ইউ?” ক্ষিপ্র হাতে টাইপ করল তিতির। “এনাফ অফ দিস জোক!”

বার্তা পৌঁছালো না। ফোন নম্বরটি ইনভ্যালিড। ও বুঝল, এগুলো সফটওয়্যার জেনারেটেড ফেক আউটগোয়িং নম্বর। আগেভাগেই টাইম দিয়ে শিডিউল করে রাখা যায় কখন মেসেজ যাবে। পাল্টা যোগাযোগ করার চেষ্টা করে লাভ হবে না। অ্যাপটা ওর নিজের মুঠোফোনেও রয়েছে। মনে আছে ওর, ম্যানেজার রাজীবদা একসময় কি টেনশনেই না থাকত অজানা প্রেরকের ভয় পাওয়ানো মেসেজের ঠেলায়। কীভাবে যেন লোকটা আন্দাজ করেছিল ষড়যন্ত্রের পিছনে তিতিরই রয়েছে। চাকরীটা গেল সেই কারণেই। রাজীবদা আজ বদলা নিচ্ছে নাকি?

মাথায় দুশ্চিন্তার বোঝা নিয়ে মোবাইল হাতে শুতে গেল তিতির। খেয়াল নেই কখন হোয়াটস্‌অ্যাপের নোটিফিকেশন মিউট করে রেখেছিল। ইনবক্স খুলতেই রীতিমত আশ্চর্য হয়ে গেল। প্রচুর নতুন অপঠিত মেসেজ পড়ে আছে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সকলে ওকে হঠাৎ কী বলতে চাইছে? কোনও খারাপ খবর নেই ত’? দুরুদুরু বুকে শুচি-র টেক্সট খুলল তিতির। ও লিখেছে, “কনগ্রাচুলেশন্স! লাইফ চেঞ্জড আর সাথে নামও? আমায় জানালে কি এমন দোষ হত?”

হতভম্ব হয়ে বসে রইল তিতির মিনিট খানেক। তারপরে ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলে যেতেই বুঝল, অ্যাকাউন্‌ট হ্যাক্‌ড হয়েছে। ডিপি-তে এক নব্য বিবাহিত দম্পতির ছবি। মেয়েটা যে তিতির নিজে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। লাইফ ইভেন্টে দেখাচ্ছে যে আজই তার বিয়ে হয়েছে রক্তিমের সঙ্গে। রক্তিম গোস্বামী, বাড়িওয়ালা রূপক বাবুর ছেলে। ছিঃ, কি কেলেঙ্কারি কাণ্ড! লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার জোগাড়। ভাড়া বাড়ির ঠাঁইটাও যাবে এইবার।

নিজের প্রোফাইল খুঁটিয়ে দেখল তিতির। এখানেও মিতা। অন্তত বায়ো-তে সেই নামই রয়েছে। ছবিটা? ধোঁকা খেয়ে গেছিল সে প্রথমে। দুটো আলাদা ছবি নিখুঁত ভাবে জোড়া ফটোশপে। কোয়েলের বিয়েতে মেরুন বেনারসি পরেছিল ও। পরে সে’দিনের তোলা একলা ফটোটা দিয়েই শাদি ডট কমে খুলেছিল নতুন অ্যাকাউন্ট। ওখান থেকেই ঝেড়েছে নিশ্চয়ই। রক্তিমের ছবিটা সম্ভবত পুরনো। ও ফেসবুকে নেই।

“আবীর, ইউ ব্লাডি স্কাউন্‌ড্রেল…”

রাগে গরগর করতে-করতে তিতিরের মনে পড়ল ফ্ল্যাটের একটা ডুপ্লিকেট চাবি আবীরের কাছে ছিল। ফেরত নেওয়া হয়েছে কি? ওকে না পাওয়ার জ্বালা জুড়োতে ছেলেটা এমন নিচে নামবে সে কল্পনাও করতে পারেনি। রক্তিমকেও এর মধ্যে টেনে এনেছে। তিতির ঠিক করল, এর শেষ দেখে ছাড়বে। সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টে আজই এফআইআর করবে। থানার নম্বর ওর কাছে নেই। বাড়িওয়ালা রূপক বাবু-র কাছে হয়তো থাকবে। তবে তিনি ঘণ্টা খানেক আগে অনেক লোকজন সাথে নিয়ে বেরিয়ে ছিলেন। ফিরে এসেছেন কি? মধ্যরাত্রে বেল বাজালে আবার রেগে যাবেন না ত’?

বেল বাজল, তবে সেটা তিতিরের দরজায়। ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত ভাবল, খুলবে কিনা। আই-হোল থাকলে উঁকি মেরে দেখা যেত কে এসেছে। হতে পারে রূপক বাবু তিতিরের খোঁজ নিতে এসেছেন। সাহস করে সে লক ঘুরিয়ে দরজাটা খুলেই ফেলল।

“একি! রক্তিম তুমি?”

বিহ্বল তিতির-কে পাশে রেখে ছেলেটা ঘরের ভিতরে ঢুকল। ভাগ্যিস রক্তিম সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই। থাকলে বিড়ম্বনার একশেষ হত। কিন্তু ওর আচার আচরণ অত্যন্ত অদ্ভুত লাগছে তিতিরের। মাথা ঝুঁকিয়ে পা টেনে-টেনে হাঁটছে। প্রতিটা নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে ঘড়ঘড় আওয়াজ আসছে বুকের ভিতর থেকে।

একটা চেয়ারে বসে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করল রক্তিম, “ভয় পেয়েছ তিতির?”

“যাক,” ছোট্ট শ্বাস ছেড়ে বলল তিতির। “তুমি সঠিক নামে ডাকলে। বাকিরা আমার আইডেন্টিটি ঘেঁটে ফেলল।“

“সবাই মিতা বলে ডাকছে বুঝি?”

“যা বলেছ। সব মনে হয় আবীরের বদমায়েশি। তুমি ত’ জানোই…”

“ওর আর দোষ কোথায় বল,” বাক্যালাপের কষ্টে হাঁপিয়ে-হাঁপিয়ে বলল রক্তিম। “আমারই তালগোল পাকিয়ে গেছে কতবার। তারমধ্যে আজকাল ডিজিটাল দুনিয়ায় উদর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া ভীষণ সোজা। ফটোশপে মিতা সিদ্ধহস্ত। বললেই ঝট করে নামিয়ে দেবে।“

“আবার মিতা?” রেগে গিয়ে বলল তিতির। “আমার ফেসবুক প্রোফাইল সেই বুঝি হ্যাক করেছে? চেঞ্জ করেছে ডিপি?”

“ওই ডিপি-র ব্যাপারটা বুঝলে আমার আবদার ছিল। তোমায় বলব ভেবেছিলাম, কিন্তু মিতা খবর পেয়ে গেল। অমনি নামিয়ে ফেলল পুরো প্ল্যান। মেয়েটা আসলে তোমায় খুবই ভালোবাসে। শুধু আমার ওপরেই যত রাগ। নাহ্‌ ভুল বললাম। শুধু আমি নই। আবীর-কেও সহ্য করতে পারে না।“

“রক্তিম, মিতা বলে কেউ নেই। সুতরাং এই নিষ্ঠুর রসিকতা তোমারই মস্তিস্কপ্রসুত। ফোনে মেসেজ পাঠানো, ছবি বদলে দেওয়া, এ’সব করে কী মজা পেলে?” চাপা গলায় জানতে চাইল তিতির। ওর শিরদাঁড়া শক্ত। টুলের ওপরে রাখা সাঁড়াশিটা ডান হাতে তুলে পিছনে লুকিয়ে রেখেছে সে। মাঝরাতে এই ঘরে রক্তিমের আসার কারণ ও জানে না। মনে কু ডাকছে। অনভিপ্রেত ঘটনা কিছু ঘটলে নিজেকে আত্মরক্ষার জন্যে প্রস্তুত রাখাই শ্রেয়।

কিন্তু ওর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হো হো করে হেসে উঠল রক্তিম। ওর কপালের গভীর ক্ষতটা তিতির এক্ষুনি লক্ষ্য করল। সে’খান দিয়ে ভলকে-ভলকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। মাংস খুবলে খুলির সাদা হাড়ও দেখা যাচ্ছে। এমন ভয়ানক আঘাত নিয়েও ছেলেটা সহজ ভাবে কথা বলছে কী করে? পাগলের মত হাসছেই বা কেন?

“মিতা এই আছে আবার এই নেই। তুমি, আমি, আমরা কেউ বুঝব কী করে?” হাসির দমক থামিয়ে বিষণ্ণ মুখে বলল রক্তিম। “কাছে চেয়েছিলাম তোমায়। তাতেও এমন গোলমাল বাঁধালে যে সব ভোগে গেল।“

“কেন?” শুকনো গলায় জিজ্ঞাসা করল তিতির।

“ঐযে, বাবা আমায় নিয়ে গেল হাসপাতালে। ফিরতে পারলাম কই সে’খান থেকে।“

“ওহ্‌,” অস্ফুটে বলল তিতির। বুঝল, এই জন্যেই তাহলে ভিড় জমায়েত হয়েছিল বাড়িতে। কে যেন ছাদ থেকে পড়ে গেছিল কলতলায়। এতক্ষণ কেন মনে পড়ছিল না? মাঝে মধ্যে নিজেকে বুঝতে পারে না তিতির। সহজ স্মৃতিগুলো খাদের ভিতরে হারিয়ে যায় পলকের মধ্যে। অনেক খুঁজেও তাদের সামনে টেনে আনতে পারে না সে।

“তোমার দোষ নেই তিতির,” আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পায়ে-পায়ে এগিয়ে এল রক্তিম। ধরা গলায় বলল, “মনে পড়ছে ছাদের সিঁড়ি, ভাঙ্গা পাঁচিল? তোমায় হয়তো বেশিই জোর করতে গেছিলাম আমি। বুঝিনি কখন মিতা চলে এসেছিল। খুব রেগে গেল সে। তারপরে …”

নিশ্চয়ই কোনও ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখছে তিতির। তাই জেগে ওঠার আশায় রক্তিমের কথা শেষ না হতেই প্রাণপণে হাত চালাল ও। সাঁড়াশিটা হাত ফসকে সশব্দে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। চোখের সামনে ধোঁয়ার মতন মিলিয়ে গেল রক্তিমের চেহারাটা। শূন্য ঘরে কেউ কোথাও নেই। দরজা যেমন বন্ধ ছিল তেমনই রয়েছে। শুধু একটা অট্টহাসি ওর অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে মিশে গেল অনন্তের মাঝে। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে ছটফট করতে করতে বিছানায় আছড়ে পড়ল তিতির।

দেওয়াল ঘড়িতে তিনটে বাজার অ্যালার্মে ঘুম ভাঙ্গল মিতার। দেখল ঘরদোরের অবস্থা চূড়ান্ত অগোছালো। আলমারি, জামাকাপড়, বিছানা, বালিশ সব ওলটপালট। মেঝেয় চলটা উঠিয়ে পড়ে আছে সাঁড়াশি। টেবিলে ঠাণ্ডা ম্যাগির বাটিতে পিঁপড়ের ভিড়। দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিতা। তিতির মেয়েটা বরাবরই উশৃঙ্খল। বন্ধুবান্ধবের হট্টগোলে একাকীত্বের অমৃত পেল কই? বারবার বিপদে পড়ে আর মিতা-কে আসতে হয় উদ্ধারে। তাও মানতে চায় না যে সে আছে। ফেসবুকের মজাটা তাই করতেই হত। যাইহোক, বিচ্ছিরি ফিনাইলের গন্ধটা আবার কোত্থেকে আসছে? হাসপাতালে এমন স্মেল পাওয়া যায়। কলতলায় শ্যাওলা পরিষ্কার করে ফিনাইল ছড়িয়েছিলেন রূপক বাবু সকালে। সেটার গন্ধও হতে পারে। রক্তিম ওখানেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল কিনা। জামাকাপড়ে রক্ত আর ফিনাইল লেগে জগাখিচুড়ি কারবার। এতোটা বাড়াবাড়ি চায়নি মিতা। ছেলেটা এমন ভীতু যে সামান্য চোখ বড় করতেই ভাঙ্গা পাঁচিল পেরিয়ে সোজা নিচে পড়ল। যাকগে, ভেবে লাভ নেই। বাড়িঘর গুছিয়ে  আবীর-কে নিয়েও প্ল্যান করতে হবে। ও খুব জ্বালাচ্ছে তিতির-কে আজকাল।।

শুক্রবার, ১৮ জুন, ২০২১

দূরত্ব

 "হোয়াট দ্য....!"


তীক্ষ্ণ
স্বরে বললাম আমি। অবিশ্বাসে চেয়ে রইলাম টেবিলের ওপর রাখা ট্যাবলেটটার কালো স্ক্রিনের দিকে। লো-ব্যাটারির নোটিফিকেশনটা খেয়ালই করিনি মিটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যে। অথচ কাল রাতে চার্জে বসিয়েছিলাম শিওর। প্লাগে ভালো ভাবে গুঁজিনি? চতুর্দিকে উদভ্রান্তের মতন চার্জিং কেবল খুঁজছিলাম তখনই অতনুদা ফোন এলো নিউইয়র্ক থেকে।

"কী হল? মিটিং ছেড়ে বেরিয়ে গেলি কেন? তোর প্রেজেন্টেশন শুরু করার কথা"

"আমায় পাঁচ মিনিট সময় দাও। ট্যাবলেটের ব্যাটারি ফুরিয়ে গেছে। কেবলটাও খুঁজে পাচ্ছি না।"

"নো গডড্যাম এক্সকিউজ রাহুল। আজ সকালেও তোকে ফোন করে মনে করিয়েছি। থ্রি মিলিয়ন ডলারের বিজনেস ইজ অ্যাট স্টেক। তোর ফাঁকিবাজিতে আমি ডুববো এখন।"

"বিশ্বাস করো অতনুদা। কাল রাতেই কাজ শেষ করে ক্লাউডে আপলোড করেছি। এখন আচমকা সুইচড্‌ অফ হয়ে গেল ট্যাব্‌টা। পাওয়ার কর্ডটা কোথায় রাখলাম..."

"জয়েন কর শিগগির। সামলাচ্ছি ততক্ষণ," অতনুদা ফোন রেখে দিল।

অতঃপর ল্যাপটপ। ওয়ার্ক ফ্রম হোম শুরু হওয়ার পরে হাই স্পিড ইন্টারনেট নিয়েছি কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা ঢেলে। কিন্তু সেখানেও গন্ডগোল। ওয়াই-ফাই ডেড। ছুটলাম পাশের ঘরে। দেখলাম, মোডেমের তার খোলা।

"এ’সব কী?" চিল্লিয়ে উঠলাম। নির্ঘাত নমিতাদি ঘর মোছার সময় এই কান্ড করেছে।

"কী হয়েছে? রবিবারের সকালে চেঁচামেচি আরম্ভ করেছ?" দেবযানী হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বলল।

"নমিতাদি-কে ছাড়িয়ে দেবে। রাউটার, মোডেম সবার তার খুলে রেখেছে। দরকারের সময় যত ঝামেলা।"

"নমিতাদি?" হেসে ফেলল দেবযানী। "মাস দেড়েক হয়ে গেল আসছেই না। ওর বাড়িতে সবার করোনা হয়েছে ভুলে গেছ। আমরাই তো বারণ করেছি ওকে আসতে।"

কথাটা ঠিক। তবে তদন্তে বসার সময় নেই। মোডেমে আলো জ্বলেছে। ওয়াই-ফাই চালু হতে এখনও মিনিট খানেক। দেরি না করে মেঝেতেই বসে পড়লাম ল্যাপটপ নিয়ে। ইথারনেট কেবল গুঁজে দিলাম মেশিনের পিছনে। দেবযানী কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। ওর ঘাড়েও অনেক কাজ। স্কুলের অনলাইন ক্লাসের নোট বানানো, রান্না-বান্না ইত্যাদি। আমার অফিসে এমন চাপ চলছে যে সাহায্য করবো তারও উপায় নেই।

যাইহোক, চেষ্টাচরিত্র করে মিটিংয়ে ঢুকলাম আবার। সবার কাছে ক্ষমাটমা চেয়ে কথা বলা আরম্ভ করতেই আবার ডিস্কানেক্‌টেড। এবারে পাওয়ার কাট্‌চাকরীটা মনে হয় গেল।

দৌড়ে বারান্দায় গেলাম। পাশের ফ্ল্যাটে দিব্যি গম্‌মিয়ে টিভি চলছে। শুধু আমারই কপাল পোড়া। কী করব এখন? আমি নিশ্চিত অতনুদা একা সামলাতে পারবে না। সিনিয়র ম্যানেজার আশিসদাও রয়েছে কনফারেন্সে। বিরাট গন্ডগোল হয়ে যাবে। সকলের মুখে চুনকালি পড়বে আমার কারণে। ছটফটিয়ে উঠে ভাবলাম সার্কিটবোর্ডে নিজেই কারিগরী করে দেখি

"একী!"

পুনরায় চমক। মেইন সুইচ টেনে নামানো রয়েছে। একটা টুল রাখা রয়েছে নিচে, মেঝেতে। ঝট্‌ করে বুঝে গেলাম আততায়ী কে।

"বিল্টু!"

গর্জন করতে-করতে সারা ফ্ল্যাটে খুঁজে শেষ পর্যন্ত তাকে পাওয়া গেল বেডরুমে, খাটের তলায়। আমার ট্যাবলেট আর মোবাইলের চার্জার, ভিডিও-গেমের কন্ট্রোলার, টিভির রিমোট ইত্যাদি অনেক কিছু জড় করে সে লুকিয়ে রয়েছে।

"আজকাল প্রচন্ড বাঁদরামি করছে ও," আমার রুদ্র রূপে মা ছেলে দুজনেই গুটিয়ে গে। "আগেরদিন আমার নতুন মোবাইল নিচে ভাঙ্গল। আজকে পুরো প্ল্যান করে… ভাবতে পারছ?"

"তুমি একটু শান্ত হও," দেবযানী বলল। "ও কেন এ’সব করছে আমাদের বুঝতে হবে। আগে তো এ’রকম ছিল না।"

"নিকুচি করেছে চাইল্ড সাইকোলজির। পিছনে নিয়মিত কয়েক ঘা দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে," আমি ধুপ্‌ধাপ্‌ করে পাশের ঘরে চলে গেলাম। সময় কোথায়? মিটিংয়ের পরে নেটফ্লিক্স। বিকেলে আইপিএল।

বিল্টু চোখের জল মুছে নতুন পরিকল্পনায় বসলো। ইলেক্ট্রনিক্স জিনিসগুলো বড্ড দুষ্টু। ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, মোবাইল, ভিডিও-গেম এরাই কেড়ে নিয়েছে বাবা-কে, ওর কাছ থেকে। তবে সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয় সেও। পরেরবার সবকটাকে একসঙ্গে বালতির জলে চোবাবে।

সোমবার, ১৪ জুন, ২০২১

নাদু ও ভাদু

 -ভাদু, রিক্সাওয়ালা ঠিক জায়গায় নামিয়েছে? দোকানের নাম দেখলুম ক্ষীরদয়াল ভবন।

-উঁহু, ভুল লেখা। ক্ষীরদয়াল কুণ্ডু আমার শ্বশুর। এ’টা ‘শ্রীদয়াল’, মদের গুমটি।


-বলছিস দোকানদার ছড়িয়েছে?

-আবার কি? নির্ঘাত তোর মতন সিদ্ধিখোর।

-যেন তুই খাসনি?

-ওরে নাদু, পাঁচ গেলাসে ভাদু পালের নেশা হয়েছে বলে কোনও দিন শুনেছিস?

-না, তা শুনিনি। তবে এই ওঁচা পাড়ায় মদের কারবার উচিত নয়।

-একদম না। বেলেল্লাপনার একশেষ। শুঁটিয়ে লাল করে দিতে হয়।

-দেওয়ালে ঢঙ করে ওঁম এঁকেছে আবার। ঢিল মারব?

-তুই জানালায় টোকা দিয়ে একখান বোতল জোগাড় কর আগে। মিছিমিছি ঝামেলা বাড়াসনি।

-সিদ্ধির ওপরে বাংলা চলবে?

-আলবাত! দৌড়াবে। আমি তো বাংলায় গান গাই…

-বিনি পয়সায় দেবে?

-কেন? তোকে যে দুটো পাঁচশ ধার দিলুম নাদু, সে’গুলো বের কর।

-পাঁচশ নয় ভাদু, পাঁচ।

-চেতনা চৈতন্য খুইয়েছিস মনে হচ্ছে। বউয়ের নামে দিব্যি করে বলতে পারি পাঁচের পাশে দুটো করে শূন্য ছিল।

-নিজের বউয়ের দিব্যি সবাই কাটতে পারে। রমাপতি-র বউয়ের নাম নিয়ে বল দেখি।

-নাঃ, তোর কথাই ঠিক। শূন্যের আবার দাম আছে নাকি?

-এক নয়া পয়সাও নয়। মাত্র দুটো নোটে রিক্সাওয়ালা খুশি মনে কত উপরি হাওয়া খাওয়াল সেটা ভাব।

-আয়, বুকে আয়। তুই আমার মাদার ফ্রম ডিফারেন্ট ব্রাদার। কিন্তু বৃষ্টি নামল যে রে নাদু? ছাতা এনেছিস?

-পকেটে ছিল, খুঁজে পাচ্ছি না।

-ধুতির আবার পকেট কি রে শালা? গায়েও শুধু স্যান্‌ডো। ফতুয়াটা কোথায় হারালি?

-পকেট মানে কোঁচড়। আমারটা ন্যানো আম্ব্রেলা, সব জায়গায় এঁটে যায়। বোতাম টিপলেই ঝপাং করে খোলে। খাসা চাইনিজ কারিগরি।

-শেষে বিলিতি মাল নিলি?

-বিলিতি না, চীনা।

-ওই একই হল। স্বদেশী তো নয় বাপু। ছাতা বানাত বটে আমার দাদু। সায়েব খ্যাদানো ষোল পাঁজরার জিনিস। পাকা সেগুন কাঠের ডান্ডি। একবার পিঠে পড়লেই ভারত ছাড়ো। উফ্‌, কি সময় ছিল তখন। চারিদিকে গান হচ্ছে, দাদুর দেওয়া মোটা ছাতা… মাথায় খুলে নে রে ভাই…! আর খুললেই পুরো গোবর্ধন পর্বত। গোটা পাড়ার লোক ধরে যায় ওর নিচে। কোথায় লাগে তোর ন্যানো তার কাছে। দূর ছাই, পা ভিজে গেল দেখ।

-বাদলায় লোকের গা ভেজে। তোর পা ভিজল কীভাবে?

-আমায় শুধোচ্ছিস কেন? জলকে জিজ্ঞেস কর।

-বৃষ্টিটা তা’লে ও’দিকেই ঝেঁপে এসেছে, বুঝলি ভাদু? এ’দিকটা খটখটে শুকনো। সরে আয় দু’পা।

-হ্যাঁ, আহাম্মকির আমসত্ত্ব। তুই আমার ঘাড়ে ওঠ আর লোকে ইয়ে ভাবুক।

-বেশ। তবে নিজের ছাতা দিয়ে কাজ চালা।

-নেই। বউ-কে গতকাল দিয়েছিলুম। সোজা বাপেরবাড়ি নিয়ে গেল।

-চুরি? ভাদু, লাগাম আলগা করেছিস তো মরেছিস। এতো ঘনঘন ও’বাড়ি দৌড়ায় কেন?

-আমিও তাই বললুম। বাপের জন্মদিন। হ্যালির ধূমকেতু তো নয়। পালন করার কী আছে?

-বললি? জিও গুরু। তারপরে?

-অতশত মনে আছে থোরাই। যাইহোক, তুই বোতল পেলি?

-ধুস্‌, দিচ্ছে না। বুড়োটা ঠ্যাঁটা। কানেও খাটো।

-আজকালকার বুড়োগুলো এমনই। আগের মতন কোয়ালিটি নেই। ছিলেন আমার দাদামশাই। কানের ফুটোয় জং, কিন্তু দিদিমা এক মাইল দূর থেকে নিন্দেমন্দ করলেও ঠিক শুনতে পেতেন।

-এই ভাদু, তোর শ্বশুর মদের ব্যবসা করে আগে বলিসনি তো। কাউন্টারে বসে গাল পাড়ছে।

-আমিও কি জানতাম? নে জলটা ধরেছে। তুই বল, এই সুযোগে আমার ছাতা ফেরত দিক। গন্ধে টেকা যাচ্ছে না।

-ছাতায় ঘেরাণও ঢাকে?

-মন থেকে চাইলেই ঢাকে। সে’বার তোর বৌদিকে নিয়ে গেছি সিনেমায়। পেট গড়বড় করছিল। আমায় ছাতা খুলে বসিয়ে দিল। মাইরি বলছি নাদু, কেউ কিচ্ছুটি টের পায়নি।

-ভাদু, ওরা কথা শুনেছে। তোর শ্বশুর আর বউ দল বেঁধে এসেছে বামাল ফেরত দিতে। একী? তুই মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিস কেন? কী বললি? ভারত ছাড়ো? ছাতা লাগবে না? আমায় দে তবে। এ’দিকেও বৃষ্টি শুরু হল এতক্ষণে।।

সোমবার, ২৪ মে, ২০২১

যন্ত্র

‘বুদ্ধিবীজী’ যন্ত্রের সার্কিট পুড়ে ধোঁয়া বেরোতে দেখে তড়িঘড়ি কন্ট্রোল প্যানেলের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। । প্রথম প্রচেষ্টাতেই সাফল্যের আশা করা অর্বাচীনতার সামিল। তাও হা-হুতাশ করতে গিয়ে খেয়ালই করিনি কখন আমার পরীক্ষা নিরীক্ষার সাবজেক্ট টিরগিটি, তার লম্বা লেজ খাড়া করে চেয়ারে উঠে বসেছে। সে’খান থেকেই গুরুজনদের মত জিজ্ঞাসা করল, “রাতে ঘুমাও না কেন?”

গবেষণায় মজে থাকলে আমার চেতনা ধোঁয়াশায় স্লথ হয়ে যায়। টিরগিটির প্রশ্ন শুনে স্বভাবতই প্রথমে ঘড়ি দেখলাম। আড়াইটে বাজে। তারপরে অবাক হয়ে ওর দিকে চাইলাম। সে ততক্ষণে লম্বা জিভ দিয়ে একটা উড়ন্ত আরশোলা টেনে নিয়ে ডিনার সারছে। কি আভিজাত্যপূর্ণ সেই চর্বন। দেখলেই ভক্তি আসে। কথা বলিয়ে টিরগিটি, মানে আমার প্রয়াস সাকসেসফুল। তবে ওর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত। ইতস্তত করে বললাম, “অনেক কাজ ভায়া। ঘুমুলেই সময় নষ্ট।“

“ওই করে ইতিমধ্যেই ব্রেনে একগাদা বিটা-অ্যামাইলয়েড জমা করেছ। ডিমেনশিয়া ধরল বলে,” টিরগিটি ভাবলেশহীন হয়ে বলল। নিজের হাতে টিকটিকি আর গিরগিটির সংমিশ্রণে একে বানিয়েছিলাম। আর, এখন তার বেজায় দেমাক। কিন্তু সে’সব ভাবার সময় কোথায় আমার। মনুষ্যেতর প্রাণীর মধ্যে বুদ্ধির বীজ বপন করতে সক্ষম হয়েছি। আনন্দে উদ্বাহু নৃত্য করতে ইচ্ছে করছে। কোনও মতে বললাম, “ও’সব ওষুধে সেরে যাবে।“

“ইকনমিক জাস্টিফিকেশনটা কী হে?’ টিরগিটি বিরক্ত হয়ে বলল। “অকারণে ফার্মা কোম্পানিগুলোকে বড়লোক করবে। তারচে’ গভীর ঘুম দিলে মগজের গ্লিম্‌ফ্যাটিক সিস্টেমটা ফ্রি-তেই ঝাড়পোঁছ করে দেবে আবর্জনা।“

আমি ততক্ষণে গড় হয়ে ‘বুদ্ধিবীজী’ মেশিনটাকে প্রণাম করছি। এর ব্যবসায়িক সাফল্য নিশ্চিতরূপেই আকাশচুম্বী হতে চলেছে। টিরগিটি যে নিমেষের মধ্যে এমন সর্ববোদ্ধা হয়ে যাবে তা আমি আশাই করিনি। ভেবেছিলাম খুব বেশি হলে আঁকজোঁক করার মতন চৈতন্য হবে। এযে রীতিমত সোনায় সোহাগা। ওকে খুশি করতে আরও দুটো আরশোলা ঝাঁটা মেরে কাছে নিয়ে আসলাম। সেগুলোও পটাপট ওর পেটে চালান হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। বুদ্ধি বাড়লে খিদেও নিশ্চয়ই বাড়ে।

বিজ্ঞানীকে অত্যাধিক উচ্ছ্বসিত হতে নেই। তাই গলায় গাম্ভীর্য এনে জানতে চাইলাম, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে কোনও বক্তব্য আছে তোমার?”

“অবশ্যই আছে। আচ্ছা বল, আফ্রিকান স্প্রিংহেয়ারের একটা প্রজাতি অন্ধকারে গোলাপি আভায় জ্বলে কেন?”

আচমকা পাল্টা জিজ্ঞাস্যে থতমত খেয়ে গেলাম আমি। আমতা-আমতা করে বললাম, “ঠিক জানি না।“

“কারণ ওরা বায়োফ্লুরোসেন্ট। ওদের লোমে পর্‌ফিরিন থাকে। অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে,” চিবিয়ে-চিবিয়ে, ধীরে সুস্থে উত্তর দিল সে।

আমি ঈষৎ ভেবলে গেলাম। বললাম, “এর সঙ্গে আবহাওয়ার কী সম্পর্ক?”

“কিচ্ছু না। তোমাকে এমনি-এমনি ঘেঁটে দিলাম,” টিরগিটি-র শরীরে লাল, সবুজ, কমলার ছটা খেলে গেল পরপর। সে উদ্ধতভাবে চেয়ে রয়েছে টেবিলের কোণায়, একটা নিরুপায় মাছির দিকে।

‘বুদ্ধিবীজী’ যন্ত্রের পারদর্শিতা আর আমার নৈপুণ্যে আজ আমিই বিমোহিত। নিজের গরিমা ঢাকতে পারলাম না আর। অস্ফুটে বলে ফেললাম, “পারফেক্ট!”

ভাবলাম, কাল সকালে খাঁচায় পড়া নেংটি ইঁদুরের ওপরে আরেকটা এক্সপেরিমেন্ট করে ফেলব। কিন্তু দেখলাম টিরগিটি-র মাইন্ড রিডিংয়ের ক্ষমতাও রয়েছে। আমার দিকে ভুরূ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “খবর্দার। মুড়িমুড়কি এক দর করবে না। শেষে নেংটি! সামাজিক স্ট্যাটাস বলে কিছু আছে তো নাকি?”

দমে গেলাম। বললাম, “ঠিক আছে। যাই গিন্নী-কে সুসংবাদটা দিয়ে আসি।“

দেখলেন? না ঘুমানোর ফল?” আরও গম্ভীর হয়ে গেল টিরগিটি। “আপনার অবস্থা দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। গিন্নী পেলেন কোথায়?”

ঘরে যেটা রয়েছে…?”

“ওটা পাশ-বালিশ।“

ইনি যখন এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছেন তখন তাই হবে। শোয়ার ঘরের বিছানায় নিঃশব্দে হাত-পা ছুঁড়লাম উল্লাসে। ল্যাবে বুদ্ধিবীজী বানানো সোজা কথা নয়। নোবেল এল বলে।

“লাথি মারছ কেন ছোটলোকের মতন?” খন্‌খনে চিৎকারে ঘাবড়ে গেলাম। পাশ-বালিশও চোখ রাঙাচ্ছে, কি আশ্চর্য! এটাকেও যন্ত্রে ট্রাই করে দেখব নাকি?

বুধবার, ৫ মে, ২০২১

অমলবাবুর বন্ধু

“একি!”

চমকে উঠলেন অমলবাবু। তাঁর চোখ আটকে রয়েছে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো কামরূপ এক্সপ্রেসের এস ১৩ কামরার দিকে। সামনের দরজা থেকে পাঁচটা জানালা পিছিয়ে এলে গরাদের ফাঁক দিয়ে যে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে, তাকে তিনি চেনেন। বাম গালের কুৎসিত জরুল, ভুরূর ওপরে কাটা দাগ, টিয়াপাখির ঠোঁটের মতন খাড়া নাক আর কোটরাগত দুটো চোখ। সবই মিলে যাচ্ছে। সমরেশ-কে চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয় তাঁর। চকিতে নিজেকে গুটিয়ে বেঞ্চের পিছনে, প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় হুমড়ি খেয়ে পড়লেন তিনি। ট্রেনটা না যাওয়া পর্যন্ত এখানে লুকিয়ে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।


মাঝেমধ্যে ভরদুপুরে জলপাইগুড়ি রোড স্টেশনে এসে বসে থাকেন অমলবাবু। এখানে বেশীরভাগ সময় ঝ্যাংক্ল্যাং শব্দ করে মালগাড়িগুলো আসে। দু’একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়ালেও বোতলে জল ভরার প্রয়োজন না থাকলে প্ল্যাটফর্মে কেউই সাধারণত নামে না। মিনিট পাঁচেকের হৈচৈয়ের পরেই শান্ত হয়ে যায় চারিদিক। ওভারব্রিজের মাথা ডিঙ্গিয়ে রোদ্দুর মাখা আকাশে মনখারাপের ঘুড়ি যখন একলা-একলা পাক খায় তখন চকচকে রেল লাইনগুলো যে কি লোভনীয় লাগে তা কেবলমাত্র অমলবাবুই বোঝেন। আজও তাঁর মন ভালো নেই। সকালে গিয়েছিলেন সাত মাসের পাওনা বাড়িভাড়ার তাগাদা করতে। লাজুক ভাবেই চেয়ে চিন্তে হাত পেতেছিলেন। কিন্তু ভাড়াটিয়া বেজায় রেগে পাড়ার গুন্ডা ডেকে আনল। তারপরে দেদার গালিগালাজ আর গলাধাক্কার উপহার। বলল ক্লাবে এসে দলিল জমা করে যেতে, নইলে রাস্তায় ফেলে মারবে। এপর্যন্ত তাও ঠিক ছিল। আসল মুশকিলটা হল অমলবাবু বাড়ির দলিল কোথায় আছে সেটাই জানেন না। মামাবাবু বলে যাওয়ার সময় পাননি। এমন নিঃসঙ্গ অসহায় পরিস্থিতিতে পড়লে মানুষ বন্ধু খোঁজে। অথচ অমলবাবু বারবার মাথা ঝাঁকালেন। সমরেশ-কে তাঁর বেজায় ভয়। মা বলতেন, সে এলে বিপদ দশ গুন বেড়ে যায়।

তাকে শেষ দেখেছিলেন বছর চল্লিশ আগে। তিনসুকিয়া ছেড়ে চলে আসার সময় বাসস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ টিপেছিল। অমলবাবুর বাবার চাকরী ছিল ডিগবয়ে। সেই সূত্রেই নর্থ আসামে বসবাস। মিশনারি স্কুলে চলত পড়াশোনা। কিন্তু কেউই মিশত না ওনার সাথে। বরং রাস্তাঘাটে ছেলেপুলেরা পিছনে লেগে অকারণে দুঃসহ করে তুলত বিকেলগুলো। সেই ঘরকুনো আঁধারেই একদিন হঠাৎ ছাদের সিঁড়িতে আলাপ হয়েছিল সমরেশের সাথে। একেবারে বিপরীত স্বভাবের ছেলে। যত্রতত্র বেয়াড়াপনা করতে তার উৎসাহের কখনও ঘাটতি হত না। অবশ্যি এই চারিত্রিক বৈপরীত্যের জন্যেই হয়তো ওদের সখ্যতা এত গাঢ় হয়েছিল।

গোলমাল হল সেখানেই। তিনি যা পারতেন না, ও নিঃশব্দে সেরে আসত তা অবলীলায়। তাঁর কোনও বারণই কানে তুলত না সমরেশ। তবে ওর সকল দুষ্টুমির দায় অদ্ভুত ভাবে এসে পড়ত ওনার কাঁধেই। কঠিন সাজা পেয়েও মুখ খুলতেন না তিনি। স্থানীয় উপজাতি নেতার ছেলে দারুক বোরা একদিন ঢিল মেরে অমলের কপাল ফাটিয়ে দিল। তার দিন সাতেক পরেই কে যেন ছেলেটাকে পিছন থেকে বস্তায় পুরে জম্পেশ পেটাল টিঙরাই নদীর চরায়। স্বাভাবিকভাবেই ওরা দুষল কিশোর অমল-কে। দাঙ্গা প্রায় বাঁধে বাঁধে। বেদম ঠ্যাঙানি খাওয়ার ভয়ে প্রথমবার বন্ধুর নাম ফাঁস করেছিলেন তিনি। কিন্তু কেউ সমরেশ-কে চিনল না। উল্টে ডাক্তারজেঠু ওকে বললেন, ‘প্যাথলজিকাল লায়ার’। বাবা তাঁকে জলপাইগুড়িতে মামারবাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। তারপরে বহু বছর কেটেছে। ঘুমিয়ে, ঝিমিয়ে মুছে গেছে অবশিষ্ট মেরুদণ্ড। বিস্মৃতির আড়ালে নিখোঁজ হয়েছে সমরেশও।

ঘন-ঘন দু’বার হুইসেল দিয়ে ইঞ্জিন ড্রাইভার জানান দিল যে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়েছে। আবার হারিয়ে যাবে সমরেশ। তাকে শেষবারের মত দেখবার আশায় অমলবাবু বেঞ্চের পিছন থেকে উঁকি দিলেন। আর তাতেই ওঁর বুক ধড়াস করে উঠল। জানালার রডে মুখ লাগিয়ে সোজাসুজি এইদিকেই চেয়ে রয়েছে সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিতে প্রচ্ছন্ন রয়েছে লুকোচুরির কৌতুক।

পড়িমরি করে দৌড়ে নিকটস্থ শৌচালয়ে ঢুকে, দরজার আড়ালে দাঁড়ালেন অমলবাবু। ধরা পড়ে গেছেন তিনি। তবে দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকা হৃদস্পন্দনের সাথে তিনি অনুভব করলেন মন খারাপ আর নেই। উল্টোদিকে, আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখে রোজের মত মুষড়ে পড়লেন না। দেখলেন, ফিরে এসেছে গর্তে ঢোকা চোখের উজ্জ্বলতা। বাম গালের জরুলটাকেও কুৎসিত দেখাচ্ছে না আর। সমরেশ নেমে পড়েছে প্ল্যাটফর্মে। এবারে নিশ্চিন্তি।। 

মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল, ২০২১

আতঙ্ক

 


“আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিবি বইতে?”

“নাঃ, কোনও দরকার নেই। সব গুলিয়ে যাবে তাহলে,” আমি ঘাড় সোজা করে বাবা-কে বললাম। “এবারে ঢুকে পড়ছি। বেশিক্ষন বাইরে অপেক্ষা করলে টেনশন বেড়ে যায়।“

“ঠিক আছে চলে যা। একদম চিন্তা  করবি না। পরীক্ষা খুব ভালো হবে,” আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে বাবা আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল। আমি চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিলাম। পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা আজ। যেখানে সিট পড়েছে তার বাইরে পুরো মেলা বসে গেছে। বাবা-মায়েরা ডাব, দইয়ের ভাঁড় নিয়ে নিজের-নিজের ছেলেকে ঘিরে উদ্বিগ্ন চেহারায় দাঁড়িয়ে। গতবছরের প্রশ্নপত্র খুব কঠিন এসেছিল। এবারে কেমন হয় তা নিয়ে বিভিন্ন জটলায় জোর আলোচনা চলছে। দূরে বোধহয় ঋতুরাজ আর সোমদেব-কে দেখতে পেলাম। ওরাও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আমি আর সময় নষ্ট না করে তিন লাফে স্কুলের ভিতরে ঢুকে পড়লাম।

বিল্ডিঙয়ের গঠন, দেওয়ালের রঙ সবই একটু অদ্ভুত। সাধারণত স্কুলে যেমন হয়, তেমন নয়। রামধনুর যথেচ্ছ পোঁচ পড়েছে সর্বত্র। এর আগে বাংলা, ইংরাজি বা অন্যান্য বিষয়ের পরীক্ষা হয়ে গেছে। তখন এতোটা বৈচিত্র নজরে আসেনি। সিঁড়ির ধাপগুলোও যেন অত্যাধিক মসৃণ। পা পিছলে আছাড় খাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমি যথোপযুক্ত সাবধানতা অবলম্বন করে দোতলায়, এক্সাম রুমে চলে এলাম।

ক্লাসে তখনও কেউ নেই। আমার জন্যে নির্ধারিত আসন রয়েছে লাস্ট বেঞ্চের আগে। সেখানে ক্লিপবোর্ড, পেন্সিল-বক্স, রুলার ইত্যাদি রেখে গুছিয়ে মাথা নিচু করে বসলাম। মনোযোগ বাড়ানোর আদর্শ উপায়। কতক্ষণ ছিলাম জানি না, অকস্মাৎ সব কটা ছেলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। সবারই ভীষণ গম্ভীর মুখ। কেউ কারোর সাথে কথা বলছে না। ওয়ার্নিং বেল পড়তেই সিল্‌ড প্রশ্নপত্র বিলি হয়ে গেল। স্নায়ু চূড়ান্তভাবে উত্তেজিত।

ফাইনাল বেলে আরম্ভ হল পরীক্ষা। ও’দিকে কোশ্চেন পেপার খুলতেই আমার চোখ ছানাবড়া। কোথায় ফিজিক্স? এযে রসায়নের কঠিন-কঠিন প্রশ্নে ভর্তি। নিশ্চয়ই কোনও গণ্ডগোল হয়েছে। ভুল করে পরের দিনের পেপার আজ দিয়ে দিয়েছে। আমি হাসি মুখে পাশে দিপাঞ্জনের দিকে তাকালাম। আশা করেছিলাম ওরও হতবাক মুখশ্রী দেখব। কিন্তু না। ছেলেটা মুখ গুঁজে একমনে লিখেই চলেছে।

“এই, কেমিস্ট্রি পেপার কেন দিয়েছে?” আমি ফিসফিস করে বললাম ওকে।

“কী দেবে তাহলে?”

“ফিজিক্স!”

“ধুস্‌, ফিজিক্স পরীক্ষা তো দু’দিন পরে।“

“বলিস কী?” আমার চোখে জল চলে এল। খুব ইচ্ছে করল এক ছুটে বাইরে বাবার কাছে চলে যাই। একটা প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ, অসহায় ভাব উঠে এল পায়ের কাছ থেকে। কতবার সবার সঙ্গে রুটিন মিলিয়েছি। তাও এত বড় ভুল কীভাবে করলাম? কী করব এখন? দু’দুটো পেপার দিতে হবে। অথচ আমার মাথা একেবারে শূন্য। কেমিস্ট্রির একটা সংজ্ঞাও মনে পড়ছে না।

“কী ব্যাপার? এক্সাম শুরু হতে না হতেই কথা বলা শুরু করে দিয়েছ?” রুমের পরিদর্শক স্যার কড়া চাহুনি নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। “খাতা কেড়ে নেব নাকি?”

“স্যার ও আজ ফিজিক্স পড়ে এসেছে,” দিপাঞ্জন দাঁত বের করে বলল। ক্লাসের বাকি ছেলেগুলো ওর কথা শুনে একবার অবজ্ঞাভরে পিছনে তাকিয়ে নিজেদের কাজে মগ্ন হয়ে গেল।

“বটে। এমন বেয়াদব, বেয়াক্কেলে ছাত্রের সাথে এমনই হওয়া উচিত,” স্যার দাঁত কিড়মিড় করলেন। “স্কুলড্রেসও পরেনি, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। ছ্যাঃ!”

খেয়াল হল, সত্যি তো। একটা পাজামা আর গেঞ্জি গায়ে বসে আছি। কি ভয়ানক! কি ভয়ানক!

ঘেমে স্নান করে উঠে পড়লাম আমি। বুকের ভিতরে ধড়াস্‌-ধড়াস্‌ করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, বিছানায় ছেলে, মেয়ে, বউ নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। রাতবিরেতে শুধু আমার চোখে আর ঘুম এল না। অফিসে কাজের চাপ বাড়লেই এই নিঃসীম আতঙ্কের দুঃস্বপ্নটা দেখি। এর থেকে মুক্তির উপায় জানা নেই।।

বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২১

ট্রু লাব


 বসন্তবিলাপ, অর্থাৎ আমাদের সূর্য স্যারের বাংলা কোচিং থেকে বেরিয়েই অয়ন আমার হাত টেনে ধরল। বলল, “ওইদিকে দেখ। মোড়ের কাছে ঝিণ্টি দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আজকেই তোকে প্রপোজ করবে।“

ধড়াস করে উঠল আমার বুক। সত্যি, ঝিণ্টি ঠায় এ’দিকেই চেয়ে রয়েছে। স্যারের সাহিত্যালোচনার ফাঁকে চোরা দৃষ্টির আদানপ্রদান হচ্ছিল শুভবিজয়ার করমর্দনের পর থেকেই। আমি তখনও মিথিলা-কে নিয়ে আশাবাদী ছিলাম বলে পত্নীনিষ্ঠতার কাঠিন্য বজায় রাখতাম চেহারায়। তবে এতদিনে মোটামুটি নিশ্চিত যে সে’কুলে আমার ঠাঁই নাই। তাই আজ বোধহয় ফিক্‌ করে হেসেও ফেলেছিলাম চাউনির উত্তরে। তাতেই নির্ঘাত দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেলেছে।

“অন্য পথ দিয়ে বাড়ি ফিরলে হয় না?” আমি প্রস্তাব দিলাম।

“ছিঃ, বৌদি তোকে কাপুরুষ ভাববে। মরদের মতন বুক চিতিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়া। ভয় কিসের?”

“আহা, এখনই বৌদি বলার কী আছে? সবে পরশু বললাম ঝিণ্টি-কে আমার খারাপ লাগে না আর ওমনি তোর লম্ফঝম্ফ শুরু। মনে নেই, আদৃতা-র বেলায় হুড়োপাড়া করতে গিয়ে কেমন কেলেঙ্কারি হয়েছিল?”

“বস্‌, আসল ব্যাপারটা হল আত্মবিশ্বাস। ওরা সেটাই দেখতে চায়। চোখে চোখ রেখে একবার কথা বলে দেখ, পুরো দুনিয়া লাট্টু,” অয়ন বলল।

“ফাঁকা কলসির বাজনা বেশী। পাপিয়া তোকে ভাই পাতায়নি?”

“ওটা মিসহ্যাপ। সায়েন্সের মেয়েদের সঙ্গে কক্ষনও প্রেম করবি না। আবহাওয়াটাই বিষাক্ত সে’খানে। ঘাড় কাত করে নোট কপি করে দিতে বলে। কিন্তু দোকলা ফুচকা খাওয়ার প্ল্যান ফাঁদলেই রাখি দিয়ে ইনস্যুরেন্স করিয়ে রাখে। তারচে’ বাংলা বা ইংরিজি কোচিং ঢের ভালো। ক্লাসে ঢুকলেই মনে হয় বাতাসে বহিছে প্রেম…”

“অ্যাই, একটা কথা ছিল। শোন্‌ এ’দিকে…”

কথায় কথায় কখন মোড়ের মাথায় চলে এসেছি, খেয়ালই করিনি। থমকালাম ঝিণ্টির তীক্ষ্ণ ডাক শুনে। অস্বীকার করব না, হঠাৎ ভীষণ ঘাবড়ে পাশের বিশ্বনাথ হার্ডওয়ার্সে সিমেন্টের বস্তা গুনতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু কমলি ছোড়নে ওয়ালি নহি। আবার হাঁক ছাড়ল, “কিরে, শুনতে পাচ্ছিস না?”

“তোকে ডাকছে মনে হয়,” আমি অয়নের জামা টেনে বললাম। “তোর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।“

“তোর বউ আমায় ডাকবে কেন হতভাগা?” অয়ন খিঁচিয়ে উঠল। “মেয়েটা একটু লক্ষ্মী ট্যারা। তাই ভুল বুঝছিস। যা, দুগ্‌গা দুগ্‌গা বলে এগিয়ে যা। “

“হারামজাদা তোকে কতবার বলেছি ট্রু লাব নিয়ে বাওয়াল দিবি না। আগ বাড়িয়ে বৌদি বৌদি করলে যাবে সব ভেস্তে আবার। যত অলক্ষুনে ব্যাপার।”

অয়ন-কে গাল পেড়ে আমি ঝিণ্টির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর এত কাছাকাছি আগে কোনও দিন আসিনি। গলা শুকিয়ে গেল তাই। তবে টের পেলাম, অয়নের চোখে ন্যাবা আছে। মেয়েটা মোটেই লক্ষ্মী ট্যারা নয়। বরং এমন ডাগর আঁখিতে আমার পায়ের তলায় ভূমিকম্প হল। না না ভুল বললাম। আর্থ-কোয়েক হয়েছিল তিয়াসার বেলায়। আর কান দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়েছিল সৌমিতার হাসি দেখে। গুলিয়ে ফেললে চলবে না। এ’বারেরটা একেবারে আলাদা অনুভূতি। সাইকেল, অটো, রিকশার হর্নকেও গিটারের ঝঙ্কার মনে হচ্ছে। দু’সপ্তাহ পরে উচ্চমাধ্যমিক শুরু। নিকুচি করেছে তার। ঝিণ্টি তুই একবার বল, নেই তোর নেই, কেউ নেই…

“হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?” কর্কশ গলায় বলল সে। “স্যার-কে গিফ্‌ট দেব বলে আমরা সবাই মিলে চাঁদা তুলেছি। তুই আর অয়ন সেই কবে থেকে ঝোলাচ্ছিস। এখুনি দু’জনে দশ টাকা করে দিয়ে দে ডিম্পি-কে।“

আশাভঙ্গের ঝনঝন আওয়াজ চেপে ঢোঁক গিলে বললাম, “ডিম্পি কে?”

“সেকিরে! তুই আমার নামও জানিস না?” ঝিণ্টির কাঁধের পিছন থেকে আরেকটা চাঁদপনা মুখ অক্ষিপুট পিটপিটিয়ে জানতে চাইল।

এক লাফে অয়নের কাছে ফিরে বললাম, “শিগগির কুড়ি টাকা বের কর।“

“বৌ… থুরি ঝিণ্টি কী বলল?”

“চুপ্‌ শালা। দেব তোর গলাটা টিপে,” আমি ক্ষেপে গিয়ে ওর কলার ধরতে যাচ্ছিলাম। তারপরে মাথা ঠাণ্ডা করে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, ডিম্পি, মানে ওই ক্যাশিয়ার মেয়েটাকে চিনিস?”

“বুধবার সন্ধ্যের ব্যাচ। কেন? ওও…ও! জিও গুরু! বৌদিকে দারুণ মানাবে কিন্তু তোর সাথে…।।“

মঙ্গলবার, ৯ মার্চ, ২০২১

রিক্ত আমি

 

সঙ্গী চলার, ফুচকা, মেলার,

ফাঁকি আজ গেল দিয়ে।

ভাবলাম তাই, বিদায় জানাই,

দূর থেকে ফুল নিয়ে।

হয়নি সেআর, শেষ দেখা তার,

ক’রে ওরা পড়িমরি,

প্ল্যাস্টিকে মুড়ে, বস্তায় পুরে,

নিয়ে গেল বেঁধে দড়ি।

বাকি নেতাগুলো, কষিয়ে শাসালো-

‘যদি দেখি এক বারও,

দরজার ধারে, গেটের এপারে,

রক্ষে রবে না কারও।‘

শূন্য উঠোনে, অসহায় কোণে,

পরিবার বসে ভাবে,

যে যাওয়ার গেছে, বাচ্চাটা আছে,

তার ভাত কিসে পাবে?

বন্ধুর ঋণ, মেটানো কঠিন,

তাও যতটুকু গেল করা,

কিছুটা খাবার, বাকিটা আবার,

শোকে কাঁধ দিয়ে লড়া।

রিক্ত, নীরবে, ফিরলাম সবে,

ফোন বেজে ওঠে সুরে,

ধমকাল ছেলে, ‘কোন্‌ আক্কেলে

পাড়া থেকে এলে ঘুরে?

শোনোনি খবরে? শ্মশানে, কবরে

ভিড় রোজ লেগে আছে।

দুনিয়া পাগল, তুলেছে আগল,

সব অযথা তোমার কাছে?

ভ্রান্তিতে ছুঁলে, বেশী অবহেলে,

রোগ ব্যামো পেলে শেষে,

পড়শিরা রেগে, দলবেঁধে চেগে,

তালা দেবে দোরে এসে।‘

বকাঝকা হলে, টাটা-বাই বলে,

কোনোমতে হাঁফ ছেড়ে,

গৃহিণী বিমুখ, হাঁড়ি হয়ে মুখ,

ঘরে দেখি উঁকি মেরে।

অভিমানী মেয়ে, মোবাইলে চেয়ে,

বল্লে যে- ‘তুমি বড়,

এত সাধাসাধি, নিষেধের বিধি,

কেন তাও জেদ করো?’

একগুঁয়ে আমি, এই ভেবে থামি,

ব্যাধি যায় ব্যাধি আসে,

কী যাবে রয়ে? অবিরাম ক্ষয়ে,

সাথী না থাকলে পাশে-

কাজ সেরে শুয়ে, তারায় তাকিয়ে,

বাকি ঘুম ফেলে রেখে,

দুই ফোঁটা জল, দুখের আঁচল,

মিশে গেল চাঁদ মেখে।।



মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আবর্তন

 “আপনি নিশ্চিত এটাই…?”

আমার অসম্পূর্ণ প্রশ্নে প্রোফেসরের অভিব্যক্তির কোনও পরিবর্তন বুঝলাম না। তিনি তখনও বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত হয়ে সারকাফেগাসের দিকেই চেয়ে রয়েছেন। সেটার ভাস্কর্যখচিত প্রকাণ্ড পাথুরে ঢাকনা অভিকর্ষ বলের ভ্রূক্ষেপ না করে অবলীলায় শূন্যে ভেসে আছে। মধ্যিখানের ইঞ্চি তিনেকের ব্যবধান দিয়ে উপচে পড়ছে শীতল নীলাভ সাদা জ্যোতি।   

“একেবারে নির্ভুল,” প্রোফেসর হাতের প্যাপাইরাসের প্রাচীন চৈনিক স্ক্রোল আলোয় তুলে ধরলেন। “ইউয়ান তাইজু, তথা চেঙ্গিস খান এখানেই শুয়ে আছেন।“

দেখলাম, সমাধিচত্বরের চারিদিকে, ভগ্নপ্রায় থাম, মূর্তি এবং ধ্বংসস্তূপের দেওয়ালে মঙ্গোল অতীতের সুস্পষ্ট ছাপ ছড়িয়ে রয়েছে। যদিও, স্ক্রোলটির পাঠোদ্ধার ব্যতীত গোবি-অলতাইয়ের ক্ষুরধার শৈলশিরার আড়ালে অদ্যাবধি অনাবিষ্কৃত মন্দির নগরীটির সন্ধান পাওয়া ছিল অসম্ভব। প্রোফেসরের কৃতিত্বে আজ আমরা ইতিহাসের ক্রূরতম শাসকের অন্তিম শয়নস্থল আবিষ্কার করেছি।  কিন্তু আদিম শবাধারের আজব লেভিটেটিং আচ্ছাদন অথবা এই অপার্থিব আলোর রহস্য উনি এখনও সমাধা করতে পারেননি।

“কী লেখা?” উইঘুর লিপি খোদিত প্রস্তরফলকের দিকে ওনার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।

“সময়ের আবর্তন,” চিন্তিত স্বরে বললেন তিনি। “আসুন নকুড়বাবু, একবার উঁকি মেরে দেখা যাক ভিতরটা।“

ইয়াকের চামড়ার বিছানায় ছোট্ট তেমুজিন ছটফটিয়ে পাশে শোয়া মা হোলানকে জড়িয়ে ধরল। আবার সে দেখেছে সেই একই দুঃস্বপ্ন। একটা চৌকো গর্তের ফোঁকর দিয়ে দুজন লোক অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত তাঁদের চেহারা। দাড়িওয়ালা বুড়োটা হাত বাড়িয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলল। তেমুজিনের পরিষ্কার মনে আছে শব্দগুলো, “আমি শঙ্কু, ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু”।।

মঙ্গলবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

যখন যেমন

 











যদি,

সুদূরে অবাক দ্বীপে,

রেশম বালি, নিছক হেসে,

সাগরের আদ্র ছোঁয়ায়,

বিভোর হয়ে, আঁচল ঘেঁসে,

সবুজের পাখনা গুলো,

অকারণেই, পাগল করে,

কপালে জলের ছিটে,

ঢেউয়ের খাঁজে, বৃষ্টি ঝরে,

হারানো পায়ের ছাপে,

ঠোঁটের কোণে, বাহার রাগে,

নিবিড়ের হাতছানিতে,

কৃষ্ণকলির ইপ্সা জাগে,

তবে,

আলগা দূরত্ব তাই,

লুকোয় ঝিনুক, গুমোর এমন,

বেখেয়াল অপেক্ষারই,

অভিমানে, যখন যেমন,

ফাগুনের আবীর গুঁড়োয়,

পেরনো পথের, গল্প হবে,

ডায়েরির ছেঁড়া পাতা,

নতুন করে, স্বপ্ন পাবে,

অভ্রে মিশবে সিঁদুর,

বুকের পাঁজর, কাঁপবে ভুরূ,

বিদায়ের শেষ বেলাতে,

তখন সবে, যাত্রা শুরু।।


রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২১

পূজাবার্ষিকী


 সন্ধ্যামণি ঝোপের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে টুপাই পুকুরে জাল ফেলা দেখছিল। আক্কাসদাদু বুক জলে দাঁড়িয়ে অভ্যস্ত হাতে ছুঁড়ে ফেলছে জালটা। কিছুক্ষণ পরে, আস্তে-আস্তে সুতো গুটানোর মতন করে তুলে আনছে সেটাকে। ধরা পড়ছে কত-কত মাছ। এ’কদিনে অনেক মাছ ধরা দেখেছে টুপাই। আক্কাসদাদু একবার ওকে কোমর অবধি জলে নামিয়েছিল। মেজমামার সেকি লাফালাফি পাড়ে দাঁড়িয়ে। তিনি এমনিতেই ভীতু মানুষ। সাঁতার না জানা ভাগ্নেকে অন্যের হাতে জলে ছাড়তে তাঁর বেজায় আপত্তি। অথচ নিজেরও নামার সাহস নেই। টুপাই অবশ্য গা করেনি। জাল ছুঁড়তে না পারলেও দড়ি ধরে গুটাতে সাহায্য তো করাই যায়। এমন সুযোগ আর কখনও পাওয়া যাবে না। সেই মতন জাল তুলে এনে তা থেকে মাছ ছাড়ানো। সেগুলোকে হাঁড়িতে করে কলতলায় নিয়ে যাওয়া। মায়ের ঘাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে বিরাট আঁশবটিতে মাছ কাটা দেখা। অবশেষে, বড় মামিমার কাছে আবদার করে ভাজা মাছ খাওয়া। এমন কত মজাদার মেছো কারবারই না করা যায় বকুলগঞ্জে এলে। মামাবাড়ি মানেই জম্পেশ আনন্দ। প্রতিবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময়েই যত মনখারাপ এসে জড় হয়। এখন যেমন তপিল নদীর চরা ধরে, কাশঝাড়ের পাশে কাঁচা পথ বেয়ে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজে টুপাইয়ের বুক চিনচিন করছে। ঢাকিরা বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে। এ’বছরের মতন দুগ্‌গা মা কৈলাস পর্বতে ফেরত চলে গেছেন। ছুটিছাটাও শেষ। ব্যাগ, সুটকেস রিক্সায় তুলছে বাবা। মা সেই কখন থেকেই পাড়াশুদ্ধু লোককে ছলছলে চোখে ‘আসি গো’ বলে এক পাও এগোচ্ছে না। শুধু টুপাই নয়, আজ সকলেরই মনখারাপ, এমনকি ক’দিনেই চেনা জংলী ফুলগুলোরও। ওদেরও কি মন আছে নাকি?

‘এইযে বাবু, এখনও জাল ফেলা দেখা হচ্ছে? মাছ ধরার আশ মেটেনি বুঝি। ওদিকে ঘরে ব্যাগ ফেলে রেখে এসেছেন। এদেরকে না, মারতে হয় খুব জোরে।’

মাথায় সজোরে গাঁট্টা খেল টুপাই। ফিরে তাকানোর আগে আলগোছে মুছে নিল চোখ। মন কেমনের কথা সবাইকে জানান দিতে চায় না সে। এখন কি আর ও ছোট আছে যে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদে ভাসাবে কচি বয়সের মতন। ছুটির শেষে কলকাতা যেতে সে এক কাণ্ড বাধাত টুপাই। বকুলগঞ্জের সকলের কানে যেত ওর কান্নার স্বর। নয়ানজুলি, পুকুর আর নদীতে ঘেরা এই গ্রামটা যে তার খুব প্রিয়। কিন্তু এবারে মা-বাবা আসতেই চায়নি। টুপাই জোর করেই নিয়ে এসেছে ওদেরকে।

‘উফ্‌, এত জোরে কেউ মারে?’ মাথায় হাত বুলিয়ে মনখুশিকে ভুরূ কুঁচকে বলল টুপাই। মেয়েটা খুব ডানপিটে। টুপাইকে ভালো মানুষ পেয়ে চাটি, গাঁট্টা লাগিয়েই রেখেছে। দু’দিন আগে ছাদ থেকে আধ খাওয়া নাসপাতির টুকরো ছুঁড়ে মেরেছিল। টুপাই তখন একমনে ঠাকুর দালানে দাদামশাইয়ের নবমী পুজো দেখছে। নাসপাতি এসে পড়লো ওর ব্রহ্মতালুতে। প্রথমে রীতিমত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। তারপরে, রেগেমেগে, ধুপধাপ করে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠে দেখে মেয়েটা খুশিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। গ্রামের সবুজ হাওয়ায়, শরতের শিশিরে ভেজা, এলোমেলো চুল সামলাতে-সামলাতে মনখুশি বলল, ‘কেমন টিপ দেখলি?’ টুপাই গোমড়া মুখে বলেছিল, ‘আমি চলে গেলে কাকে মারিস দেখবো। খালি তোর কথায়-কথায় খিল্‌খিল্‌। এত হাসে নাকি কেউ অকারণে? মহা বিরক্তিকর অভ্যেস।‘ কড়া কথা শুনিয়েও কোনো লাভ হয় না। একটু পরেই যেই কে সেই। এখন আবার গাঁট্টা মেরে এমন কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন টুপাই বিরাট কিছু কেলেঙ্কারি বাধিয়ে বসেছে।

‘মারব না কেন? আমি পরশুদিন পুজোর সাজগোজ ভুলে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে গল্পের বইগুলো খুঁজে বের করলাম। তারপরে, সুন্দর করে গুছিয়ে, ব্যাগে ভরে কালকে দিয়ে গেলাম তোর হাতে। সেগুলোর কোনো মূল্যই দিলি না। আমি ঠিক জানতাম, তুই ভুলবি, গবেট কোথাকার। রিক্সার প্যাক্‌-প্যাকানি শুনেই আমি এক ছুটে দোতলায় তোদের ঘরে গিয়ে দেখি ঠিক তাই। বিছানায় ফেলে রাখা আছে ব্যাগটা,’ প্রবলভাবে দু’হাত নেড়ে আর কানের দুল ঝাঁকিয়ে অভিমান বুঝিয়ে দিল মনখুশি। পুজোর মধ্যে এক দিন টুপাই ওকে বলেছিল বই পড়ার শখের কথা। মেয়েটা সেটা মনে রেখে, সারা গ্রাম ঘুরে খান দশেক বই জোগাড় করে এনেছে। নিজের বাড়ি হোক বা পড়শির ঘর, কোথাও খুঁজতে বাকি রাখেনি সে। টুপাই যদি বলে বসে, বকুলগঞ্জে কেউ বই পড়েনা, তাহলে মনখুশির মাথা হেঁট হয়ে যাবে না?   

‘হ্যাঁরে, তোর সবকটা পড়া হয়ে গেছে? আমায় যে দিয়ে দিলি বড়। আপসোস করবি না তো পরে?’ টুপাই ঘাস ঝাড়তে-ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালো। মনখুশি, নিজের হাতে বানানো, খুব সুন্দর একটা ঝোলা’তে নিয়ে এসেছে বইগুলো। ওর হাত থেকে সেটা নিয়ে পায়ে-পায়ে রিক্সার দিকে এগোতে শুরু করলো টুপাই। মেয়েটা ওর পিছুপিছু। ওকে জানতে দিলে হবে না, সে ইচ্ছে করেই ফেলে রেখে এসেছিল ব্যাগটা। এগুলো ফেরত দিতে আর কি আসা হবে? পাগলি মেয়ে, কিছুই বোঝে না। এ’কদিন সারাক্ষণ ছায়ার মতন লেগেছিল সাথে। মিছিমিছি মায়া বাড়ায় দস্যিপনা করে।    

‘মাত্র একটা পড়েছি। তোদের শহরে কাজ-কম্ম কারোর থাকে না বাপু। তাই লোকে খালি বসে-বসে বই পড়ে দিগ্‌গজ হয়। আমি এখানে কুল পেড়ে, পেয়ারা খেয়ে হয়রাণ হয়ে যাই। আমার পড়ার সময় কোথায়?’

মনখুশির কথায় হেসে ফেলে টুপাই। খেলাধুলার সময় যেমন মাতব্বরি, কথা বলার সময় তেমনই পাকা বুড়ির মতন হাবভাব ওর। পৃথিবীর সবকিছুই যেন জেনে বসে আছে সে। গোবেচারা ছেলেটা ওর কাছে নেহাতই দুধভাত। দিদিমার কাছ থেকে পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে সকলের সাথে বসে ফল কাটছিল  সপ্তমীর দিন। টুপাই বারান্দায় বসে চুপটি করে ওর ছবি এঁকে নিয়েছিল এক ফাঁকে। আজ সকালে মা’কে লুকিয়ে ছবিটা রেখে দিয়েছিল ফেলে আসা বইয়ের পাতার ভাঁজে। হায় রে, এই ঝোলার সাথে সেটাও নিশ্চয়ই ফেরত এলো ওর কাছে।

‘হাসছিস কেন রে?’ চোখ পাকিয়ে জানতে চাইল মনখুশি। ওকে নিয়ে মস্করা বেজায় অপছন্দ মেয়েটার। মনখুশির এবং টুপাইয়ের মায়েরা মেয়েবেলার বন্ধু। তাই মল্লিক বাড়ি মনখুশির নিজের না হলেও নিজের থেকেও বেশি। এই বাড়ির দরজা তার জন্যে সর্বদাই খোলা। সবার সাথে মনখুশির যেমন ভাব তেমন ঝগড়াও। দাদামশাই বা দিদিমা মাঝেমধ্যে ওকে নাতবউ বলে খেপায়। মামিরাও তাল দেয় ওদের সাথে। মনখুশি কিন্তু রেগে স্বয়ং লক্ষ্মীবাঈ হয়ে যায়। মুক্তোর মালা পড়ানোর জন্য আর বাঁদর পেল না ওরা? এই ঠাট্টা শুনেই তো গাঁয়ের লোকেরা নানা কথা রটায়। টুপাই তো ওর বন্ধু। বন্ধুকে আবার কেউ বিয়ে করে নাকি? গত বছর ঝুমিদি’র বিয়ে হল বটজোড়াতে। জামাইয়ের কেমন বেশ ভরিক্কি চেহারা। তেমন না হলে বর বলে মানতে ইচ্ছে হয় কারো?

‘মা তোকে গিন্নীমা কেন বলে বেশ বুঝতে পারছি,’ চোখে কৌতুকের হাসি নিয়ে বলল টুপাই। শীর্ণ হাতে গল্পের বোঝা টানা সহজ নয় ওর পক্ষে। তবুও মজার কথায় হাসি আসে বৈকি।

‘তা মণিমাসি যা বলে বলুক, আমার কিন্তু খুব শিগ্‌গিরই বইগুলো ফেরত চাই বলে দিলাম।’

‘এই যে বললি তোর পড়ার সময় নেই?’

‘খালি তুই বুঝি পড়বি আর আমি গো-মুখ্যু হয়ে থাকবো চিরকাল? সে হবে না। পড়া হয়ে গেলেই এখানে এসে দিয়ে যাবি,’ মনখুশি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। চোখে তার অদ্ভুত কাতরতা। এত কষ্ট করে আগল তুলে রাখা কাঠিন্য ভেসে গেল বুঝি। টুপাইয়ের হাত টেনে ধরে সে বলে উঠল, ‘আমার দিব্যি। বল, তুই এসে বইগুলো ফেরত দিবি।’

ঢোঁক গিলতে কষ্ট হল টুপাইয়ের। প্রশ্ন যে বড়ই কঠিন। এবারের পুজোয়, সকলে ঠাকুরের কাছে এই কথাটাই জানতে চেয়েছে বারবার। অষ্টমীর সারা রাত মা, দিদিমা, মামিরা মূর্তির পা ছুঁয়ে বসে থেকে আকুল মনে প্রার্থনা করেছে, টুপাই যেন আবার আসতে পারে সামনের বার। দশমীর বিসর্জনে বাবার চোখেও জল এসেছিল কি? বিজয়া করতে গিয়ে দাদামশায়ের বুকে জড়িয়ে ধরা বা দিদিমার আদর সবই যেন অনেক-অনেক স্পেশাল টুপাইয়ের কাছে। কি যায় আসে, রক্ত কণিকাগুলো নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে আর যদি ওকে এখানে আসতে না দেয়। এত আনন্দ, হৈ- হুল্লোড়, ভালোবাসা সব সে একান্ত নিজের করে রেখেছে। সেটা কাড়বে, সেই সাধ্য কারোর নেই।

‘সামনের বছর পুজোতে আমি অন্য কোথাও ঘুরতে যাব। এখানে আসা হবে না হয়তো। গেল তোর বইগুলো,’ রিক্সায় ব্যাগ রেখে বলল টুপাই। ওর বাবা আর মা একটা রিক্সাতে উঠে পড়েছে। টুপাই পরেরটাতে একলাই যাবে। মনখুশির দিকে ফিরে দেখল ওর মুখের আলো হঠাৎ দপ্‌ করে নিভে গেছে। বেচারি মেয়েটা বই না পেলে খুব দুঃখ পাবে মনে হয়। টুপাই তড়িঘড়ি ওকে খুশি করতে বলল, ‘তুই একদম চিন্তা করিস না। মেজমামা এর মধ্যে কলকাতা গেলে, আমি ঠিক মনে করে ফেরত পাঠিয়ে দেব।’

মনখুশির মুখে হাসি ফুটল না তাতে। টুপাইয়ের ঘুরতে যাওয়ার মানে সে জানে। বিদায় কালে মনিমাসির চোখের জল ফেলা সে শুনেছে। চৌচির হয়ে গেছে ওর বুকের ভিতরটা। টুপাই তাকে এমন ফাঁকি দেবে সে কি কোনোদিন ভেবেছিল? বকুলগঞ্জের মনখুশির খুব ইচ্ছে করছিল ঠাকুর দালানে গিয়ে আছড়ে পড়ে, দিদিমার মতন। কিন্তু তাহলে টুপাই জীতে যাবে যে। বলবে, মনখুশিটা এমন ভীতু, যাওয়ার বেলা সামনে পর্যন্ত এলো না। কোমরে আঁচল গুঁজে চলে এসেছে তাই ঠোঁট কামড়ে। দুকূল ভাঙ্গা ঝড় ঠেকিয়ে রেখে গল্পের নকশীকাঁথা বুনেছে এতক্ষণ। কিন্তু আর বোধহয় সেই স্রোতে বাঁধ দেওয়া গেল না। গেঁয়ো মেয়ের গ্রাম্য বাঁধন ভেসে গেল উজানের টানে। লোকলজ্জার ভয় সাঁঝবাতির শিখার মতন নিভিয়ে সে আছড়ে পড়ল প্রিয় বন্ধুর বুকে। অভিমানে তার প্রশ্ন বুঁজে যায়, ‘পুজো ছাড়া এমনি বুঝি আসতে নেই এখানে?’

উত্তর কোথায় টুপাইয়ের কাছে। তার চারপাশের জগতটা আজকাল সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতনই স্থির। আঁকাবাঁকা নদীর ওপরে ধুলোময় কাল্‌ভার্‌ট পেরিয়ে ওর রিক্সা ধীর গতিতে এগিয়ে যায় স্টেশনের দিকে। মনখুশির দেওয়া বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখে হাসি ফুটে ওঠে টুপাইয়ের মুখে। মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’ বইয়ের ফাঁকে গুঁজে রাখা ছবিটা আর নেই। তার জায়গায়, সাদা টুকরো কাগজে সুন্দর, গোটা-গোটা হরফে লেখা রয়েছে একটা কবিতা। বকুলগঞ্জের দিগন্তে তখন চাঁদের আনাগোনা। পাখিদের বুকে ঘরে ফেরার গান। ঝরা শিউলি, পেঁজা মেঘ আর কলাবউয়ের স্মৃতি পেরিয়ে দুই কিশোর মনে অধীর জিজ্ঞাসা, পূজাবার্ষিকীর পরবর্তী সংখ্যায় ওদের নিয়ে কোনো গল্প থাকবে কি?

 

যেদিন আসবি আবার, কাশফুলের ভোরে,

শিউলির আলো ছায়ায়, আলসে পথ ধরে,

রোদে পিঠ ছাদে আর আকাশ জুড়ে ছবি,

যেতে না দেই যদি, তবে আবার বন্ধু হবি?