রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২১

পূজাবার্ষিকী


 সন্ধ্যামণি ঝোপের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে টুপাই পুকুরে জাল ফেলা দেখছিল। আক্কাসদাদু বুক জলে দাঁড়িয়ে অভ্যস্ত হাতে ছুঁড়ে ফেলছে জালটা। কিছুক্ষণ পরে, আস্তে-আস্তে সুতো গুটানোর মতন করে তুলে আনছে সেটাকে। ধরা পড়ছে কত-কত মাছ। এ’কদিনে অনেক মাছ ধরা দেখেছে টুপাই। আক্কাসদাদু একবার ওকে কোমর অবধি জলে নামিয়েছিল। মেজমামার সেকি লাফালাফি পাড়ে দাঁড়িয়ে। তিনি এমনিতেই ভীতু মানুষ। সাঁতার না জানা ভাগ্নেকে অন্যের হাতে জলে ছাড়তে তাঁর বেজায় আপত্তি। অথচ নিজেরও নামার সাহস নেই। টুপাই অবশ্য গা করেনি। জাল ছুঁড়তে না পারলেও দড়ি ধরে গুটাতে সাহায্য তো করাই যায়। এমন সুযোগ আর কখনও পাওয়া যাবে না। সেই মতন জাল তুলে এনে তা থেকে মাছ ছাড়ানো। সেগুলোকে হাঁড়িতে করে কলতলায় নিয়ে যাওয়া। মায়ের ঘাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে বিরাট আঁশবটিতে মাছ কাটা দেখা। অবশেষে, বড় মামিমার কাছে আবদার করে ভাজা মাছ খাওয়া। এমন কত মজাদার মেছো কারবারই না করা যায় বকুলগঞ্জে এলে। মামাবাড়ি মানেই জম্পেশ আনন্দ। প্রতিবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময়েই যত মনখারাপ এসে জড় হয়। এখন যেমন তপিল নদীর চরা ধরে, কাশঝাড়ের পাশে কাঁচা পথ বেয়ে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজে টুপাইয়ের বুক চিনচিন করছে। ঢাকিরা বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে। এ’বছরের মতন দুগ্‌গা মা কৈলাস পর্বতে ফেরত চলে গেছেন। ছুটিছাটাও শেষ। ব্যাগ, সুটকেস রিক্সায় তুলছে বাবা। মা সেই কখন থেকেই পাড়াশুদ্ধু লোককে ছলছলে চোখে ‘আসি গো’ বলে এক পাও এগোচ্ছে না। শুধু টুপাই নয়, আজ সকলেরই মনখারাপ, এমনকি ক’দিনেই চেনা জংলী ফুলগুলোরও। ওদেরও কি মন আছে নাকি?

‘এইযে বাবু, এখনও জাল ফেলা দেখা হচ্ছে? মাছ ধরার আশ মেটেনি বুঝি। ওদিকে ঘরে ব্যাগ ফেলে রেখে এসেছেন। এদেরকে না, মারতে হয় খুব জোরে।’

মাথায় সজোরে গাঁট্টা খেল টুপাই। ফিরে তাকানোর আগে আলগোছে মুছে নিল চোখ। মন কেমনের কথা সবাইকে জানান দিতে চায় না সে। এখন কি আর ও ছোট আছে যে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদে ভাসাবে কচি বয়সের মতন। ছুটির শেষে কলকাতা যেতে সে এক কাণ্ড বাধাত টুপাই। বকুলগঞ্জের সকলের কানে যেত ওর কান্নার স্বর। নয়ানজুলি, পুকুর আর নদীতে ঘেরা এই গ্রামটা যে তার খুব প্রিয়। কিন্তু এবারে মা-বাবা আসতেই চায়নি। টুপাই জোর করেই নিয়ে এসেছে ওদেরকে।

‘উফ্‌, এত জোরে কেউ মারে?’ মাথায় হাত বুলিয়ে মনখুশিকে ভুরূ কুঁচকে বলল টুপাই। মেয়েটা খুব ডানপিটে। টুপাইকে ভালো মানুষ পেয়ে চাটি, গাঁট্টা লাগিয়েই রেখেছে। দু’দিন আগে ছাদ থেকে আধ খাওয়া নাসপাতির টুকরো ছুঁড়ে মেরেছিল। টুপাই তখন একমনে ঠাকুর দালানে দাদামশাইয়ের নবমী পুজো দেখছে। নাসপাতি এসে পড়লো ওর ব্রহ্মতালুতে। প্রথমে রীতিমত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। তারপরে, রেগেমেগে, ধুপধাপ করে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠে দেখে মেয়েটা খুশিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। গ্রামের সবুজ হাওয়ায়, শরতের শিশিরে ভেজা, এলোমেলো চুল সামলাতে-সামলাতে মনখুশি বলল, ‘কেমন টিপ দেখলি?’ টুপাই গোমড়া মুখে বলেছিল, ‘আমি চলে গেলে কাকে মারিস দেখবো। খালি তোর কথায়-কথায় খিল্‌খিল্‌। এত হাসে নাকি কেউ অকারণে? মহা বিরক্তিকর অভ্যেস।‘ কড়া কথা শুনিয়েও কোনো লাভ হয় না। একটু পরেই যেই কে সেই। এখন আবার গাঁট্টা মেরে এমন কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন টুপাই বিরাট কিছু কেলেঙ্কারি বাধিয়ে বসেছে।

‘মারব না কেন? আমি পরশুদিন পুজোর সাজগোজ ভুলে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে গল্পের বইগুলো খুঁজে বের করলাম। তারপরে, সুন্দর করে গুছিয়ে, ব্যাগে ভরে কালকে দিয়ে গেলাম তোর হাতে। সেগুলোর কোনো মূল্যই দিলি না। আমি ঠিক জানতাম, তুই ভুলবি, গবেট কোথাকার। রিক্সার প্যাক্‌-প্যাকানি শুনেই আমি এক ছুটে দোতলায় তোদের ঘরে গিয়ে দেখি ঠিক তাই। বিছানায় ফেলে রাখা আছে ব্যাগটা,’ প্রবলভাবে দু’হাত নেড়ে আর কানের দুল ঝাঁকিয়ে অভিমান বুঝিয়ে দিল মনখুশি। পুজোর মধ্যে এক দিন টুপাই ওকে বলেছিল বই পড়ার শখের কথা। মেয়েটা সেটা মনে রেখে, সারা গ্রাম ঘুরে খান দশেক বই জোগাড় করে এনেছে। নিজের বাড়ি হোক বা পড়শির ঘর, কোথাও খুঁজতে বাকি রাখেনি সে। টুপাই যদি বলে বসে, বকুলগঞ্জে কেউ বই পড়েনা, তাহলে মনখুশির মাথা হেঁট হয়ে যাবে না?   

‘হ্যাঁরে, তোর সবকটা পড়া হয়ে গেছে? আমায় যে দিয়ে দিলি বড়। আপসোস করবি না তো পরে?’ টুপাই ঘাস ঝাড়তে-ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালো। মনখুশি, নিজের হাতে বানানো, খুব সুন্দর একটা ঝোলা’তে নিয়ে এসেছে বইগুলো। ওর হাত থেকে সেটা নিয়ে পায়ে-পায়ে রিক্সার দিকে এগোতে শুরু করলো টুপাই। মেয়েটা ওর পিছুপিছু। ওকে জানতে দিলে হবে না, সে ইচ্ছে করেই ফেলে রেখে এসেছিল ব্যাগটা। এগুলো ফেরত দিতে আর কি আসা হবে? পাগলি মেয়ে, কিছুই বোঝে না। এ’কদিন সারাক্ষণ ছায়ার মতন লেগেছিল সাথে। মিছিমিছি মায়া বাড়ায় দস্যিপনা করে।    

‘মাত্র একটা পড়েছি। তোদের শহরে কাজ-কম্ম কারোর থাকে না বাপু। তাই লোকে খালি বসে-বসে বই পড়ে দিগ্‌গজ হয়। আমি এখানে কুল পেড়ে, পেয়ারা খেয়ে হয়রাণ হয়ে যাই। আমার পড়ার সময় কোথায়?’

মনখুশির কথায় হেসে ফেলে টুপাই। খেলাধুলার সময় যেমন মাতব্বরি, কথা বলার সময় তেমনই পাকা বুড়ির মতন হাবভাব ওর। পৃথিবীর সবকিছুই যেন জেনে বসে আছে সে। গোবেচারা ছেলেটা ওর কাছে নেহাতই দুধভাত। দিদিমার কাছ থেকে পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে সকলের সাথে বসে ফল কাটছিল  সপ্তমীর দিন। টুপাই বারান্দায় বসে চুপটি করে ওর ছবি এঁকে নিয়েছিল এক ফাঁকে। আজ সকালে মা’কে লুকিয়ে ছবিটা রেখে দিয়েছিল ফেলে আসা বইয়ের পাতার ভাঁজে। হায় রে, এই ঝোলার সাথে সেটাও নিশ্চয়ই ফেরত এলো ওর কাছে।

‘হাসছিস কেন রে?’ চোখ পাকিয়ে জানতে চাইল মনখুশি। ওকে নিয়ে মস্করা বেজায় অপছন্দ মেয়েটার। মনখুশির এবং টুপাইয়ের মায়েরা মেয়েবেলার বন্ধু। তাই মল্লিক বাড়ি মনখুশির নিজের না হলেও নিজের থেকেও বেশি। এই বাড়ির দরজা তার জন্যে সর্বদাই খোলা। সবার সাথে মনখুশির যেমন ভাব তেমন ঝগড়াও। দাদামশাই বা দিদিমা মাঝেমধ্যে ওকে নাতবউ বলে খেপায়। মামিরাও তাল দেয় ওদের সাথে। মনখুশি কিন্তু রেগে স্বয়ং লক্ষ্মীবাঈ হয়ে যায়। মুক্তোর মালা পড়ানোর জন্য আর বাঁদর পেল না ওরা? এই ঠাট্টা শুনেই তো গাঁয়ের লোকেরা নানা কথা রটায়। টুপাই তো ওর বন্ধু। বন্ধুকে আবার কেউ বিয়ে করে নাকি? গত বছর ঝুমিদি’র বিয়ে হল বটজোড়াতে। জামাইয়ের কেমন বেশ ভরিক্কি চেহারা। তেমন না হলে বর বলে মানতে ইচ্ছে হয় কারো?

‘মা তোকে গিন্নীমা কেন বলে বেশ বুঝতে পারছি,’ চোখে কৌতুকের হাসি নিয়ে বলল টুপাই। শীর্ণ হাতে গল্পের বোঝা টানা সহজ নয় ওর পক্ষে। তবুও মজার কথায় হাসি আসে বৈকি।

‘তা মণিমাসি যা বলে বলুক, আমার কিন্তু খুব শিগ্‌গিরই বইগুলো ফেরত চাই বলে দিলাম।’

‘এই যে বললি তোর পড়ার সময় নেই?’

‘খালি তুই বুঝি পড়বি আর আমি গো-মুখ্যু হয়ে থাকবো চিরকাল? সে হবে না। পড়া হয়ে গেলেই এখানে এসে দিয়ে যাবি,’ মনখুশি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। চোখে তার অদ্ভুত কাতরতা। এত কষ্ট করে আগল তুলে রাখা কাঠিন্য ভেসে গেল বুঝি। টুপাইয়ের হাত টেনে ধরে সে বলে উঠল, ‘আমার দিব্যি। বল, তুই এসে বইগুলো ফেরত দিবি।’

ঢোঁক গিলতে কষ্ট হল টুপাইয়ের। প্রশ্ন যে বড়ই কঠিন। এবারের পুজোয়, সকলে ঠাকুরের কাছে এই কথাটাই জানতে চেয়েছে বারবার। অষ্টমীর সারা রাত মা, দিদিমা, মামিরা মূর্তির পা ছুঁয়ে বসে থেকে আকুল মনে প্রার্থনা করেছে, টুপাই যেন আবার আসতে পারে সামনের বার। দশমীর বিসর্জনে বাবার চোখেও জল এসেছিল কি? বিজয়া করতে গিয়ে দাদামশায়ের বুকে জড়িয়ে ধরা বা দিদিমার আদর সবই যেন অনেক-অনেক স্পেশাল টুপাইয়ের কাছে। কি যায় আসে, রক্ত কণিকাগুলো নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে আর যদি ওকে এখানে আসতে না দেয়। এত আনন্দ, হৈ- হুল্লোড়, ভালোবাসা সব সে একান্ত নিজের করে রেখেছে। সেটা কাড়বে, সেই সাধ্য কারোর নেই।

‘সামনের বছর পুজোতে আমি অন্য কোথাও ঘুরতে যাব। এখানে আসা হবে না হয়তো। গেল তোর বইগুলো,’ রিক্সায় ব্যাগ রেখে বলল টুপাই। ওর বাবা আর মা একটা রিক্সাতে উঠে পড়েছে। টুপাই পরেরটাতে একলাই যাবে। মনখুশির দিকে ফিরে দেখল ওর মুখের আলো হঠাৎ দপ্‌ করে নিভে গেছে। বেচারি মেয়েটা বই না পেলে খুব দুঃখ পাবে মনে হয়। টুপাই তড়িঘড়ি ওকে খুশি করতে বলল, ‘তুই একদম চিন্তা করিস না। মেজমামা এর মধ্যে কলকাতা গেলে, আমি ঠিক মনে করে ফেরত পাঠিয়ে দেব।’

মনখুশির মুখে হাসি ফুটল না তাতে। টুপাইয়ের ঘুরতে যাওয়ার মানে সে জানে। বিদায় কালে মনিমাসির চোখের জল ফেলা সে শুনেছে। চৌচির হয়ে গেছে ওর বুকের ভিতরটা। টুপাই তাকে এমন ফাঁকি দেবে সে কি কোনোদিন ভেবেছিল? বকুলগঞ্জের মনখুশির খুব ইচ্ছে করছিল ঠাকুর দালানে গিয়ে আছড়ে পড়ে, দিদিমার মতন। কিন্তু তাহলে টুপাই জীতে যাবে যে। বলবে, মনখুশিটা এমন ভীতু, যাওয়ার বেলা সামনে পর্যন্ত এলো না। কোমরে আঁচল গুঁজে চলে এসেছে তাই ঠোঁট কামড়ে। দুকূল ভাঙ্গা ঝড় ঠেকিয়ে রেখে গল্পের নকশীকাঁথা বুনেছে এতক্ষণ। কিন্তু আর বোধহয় সেই স্রোতে বাঁধ দেওয়া গেল না। গেঁয়ো মেয়ের গ্রাম্য বাঁধন ভেসে গেল উজানের টানে। লোকলজ্জার ভয় সাঁঝবাতির শিখার মতন নিভিয়ে সে আছড়ে পড়ল প্রিয় বন্ধুর বুকে। অভিমানে তার প্রশ্ন বুঁজে যায়, ‘পুজো ছাড়া এমনি বুঝি আসতে নেই এখানে?’

উত্তর কোথায় টুপাইয়ের কাছে। তার চারপাশের জগতটা আজকাল সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতনই স্থির। আঁকাবাঁকা নদীর ওপরে ধুলোময় কাল্‌ভার্‌ট পেরিয়ে ওর রিক্সা ধীর গতিতে এগিয়ে যায় স্টেশনের দিকে। মনখুশির দেওয়া বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখে হাসি ফুটে ওঠে টুপাইয়ের মুখে। মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’ বইয়ের ফাঁকে গুঁজে রাখা ছবিটা আর নেই। তার জায়গায়, সাদা টুকরো কাগজে সুন্দর, গোটা-গোটা হরফে লেখা রয়েছে একটা কবিতা। বকুলগঞ্জের দিগন্তে তখন চাঁদের আনাগোনা। পাখিদের বুকে ঘরে ফেরার গান। ঝরা শিউলি, পেঁজা মেঘ আর কলাবউয়ের স্মৃতি পেরিয়ে দুই কিশোর মনে অধীর জিজ্ঞাসা, পূজাবার্ষিকীর পরবর্তী সংখ্যায় ওদের নিয়ে কোনো গল্প থাকবে কি?

 

যেদিন আসবি আবার, কাশফুলের ভোরে,

শিউলির আলো ছায়ায়, আলসে পথ ধরে,

রোদে পিঠ ছাদে আর আকাশ জুড়ে ছবি,

যেতে না দেই যদি, তবে আবার বন্ধু হবি?

বেলতলা


 ব্রুক্‌স, ইয়ে, মানে তোমার একটু সময় হবে?”

কানের লতি চুলকাতে-চুলকাতে আমার ম্যানেজার ব্রুক্‌স নিকলসনের কিউবের সামনে দাঁড়ালাম। সাড়ে ছয় ফুটিয়া দৈত্যাকার ব্রুক্‌স তখন ওর নিপীড়িত চেয়ারে গা ছড়িয়ে ফোনে গিন্নির সাথে প্রেমালাপ করছে। এক্কেবারে টাটকা তিন নম্বর বিয়ে। হানিমুনের হানি এখনও চোখের পাতা ছেড়ে যায়নি। দিনরাত তাই কোম্পানির পয়সায় হাহা হিহি চলছে। অতি গোপন ফিসফাস আমাদের কানে এলেও তার কিছু যায় আসে না। অত উচ্চতা থেকে বাকি মানুষদের দেখতেই পায় না হয়তো। ওকেও দোষ দেওয়া যায় না। সিন্ধুদেশের এতগুলো চাকর-বাকর চব্বিশ ঘণ্টা আসেপাশে তৈলাক্ত বাঁশে আরও তেল ঢালার প্রতিযোগিতায় মেতে রয়েছে। তাদেরকে মানুষের চেয়ে বাঁদর মনে করাই স্বাভাবিক। আর বাঁদরকে রামায়ণের পরে কেইবা তেমন পাত্তা দিয়েছে? যাইহোক, ব্রুক্‌স সাহেব আমার উপস্থিতিকে উপেক্ষা করে নৈশভোজ এবং ততঃপরবর্তী পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ডাবল মিনিং আলাপ আলোচনা চালিয়ে গেলেন রিসিভারের অপর প্রান্তে থাকা সুন্দরীর সঙ্গে। হ্যাঁ, সুন্দরীই তো মনে হচ্ছে। ব্রুক্‌সের টেবিলে জাপটা-জাপটি ভঙ্গিমায় থাকা ছবি যদি আপডেটেড হয় তাহলে ওই মহিলাই ওর তৃতীয় পক্ষ।

ব্রুক্‌স, একটা জরুরী ব্যাপার…”

গরিলার সমান হাতের পাঞ্জা তুলে আমায় চুপ করতে বলল সে। কুঞ্চিত ভুরূতে প্রচ্ছন্ন বিতৃষ্ণা, আমার প্রতি। ট্রু লাভে অকারণ বিঘ্ন কারই বা পোষায়। নতুন বউয়ের সাথে দীর্ঘ দু’ঘণ্টা দেখা না হওয়ার বিরহে পুরুষমানুষের কিঞ্চিৎ শোকাতুর হওয়া বিরল ঘটনা নয়। অতএব আমায় আরও অপেক্ষা করতে হবে। নিজের কিউবে ফিরে যাবো তারও সাহস নেই। আমার কচি মনে কু ডাকছে। ইচ্ছে করছে, এক্ষুনি চিৎকার করে সকলকে বিষয়টা জানাই। কিন্তু গলা শুকিয়ে কাঠ। অগত্যা ওইখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ইতিউতি চাইলাম।

উপল এই সময়ে রোজ বাইরে ম্যাপল গাছের নিচে আধঘণ্টার জন্যে সিগারেট খেতে যায় ওর ম্যানেজারের সাথে। গোটা দিনে ছ’বার এমন আউটিং হয় ওদের। কিছু লোক কপাল করে আসে মাইরি। কি এক ধ্যাদ্ধেরে প্রোজেক্টের প্রোডাকশন সাপোর্টে অনসাইটে এসেছে ব্যাটা। মাস পয়লায় একটা ফাইল চালাতে হয়, ব্যস। বাকি দিনগুলোতে খালি ফুক্‌ফুক্‌ করে বিড়ি খায় আর গাছতলায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য নিয়ে গুরু গম্ভীর আলোচনা করে। ও’দিকে তমশ্রী প্রতিদিনের মত সমুদ্রদার ডেস্কে বসে খেজুরে আলাপ করছে। সমুদ্রদা এই অ্যাকাউন্‌টে ক্লায়েন্ট পার্টনার। তমশ্রী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওকে মাছের ঝোল খাইয়ে খাইয়েই বিয়ের প্রস্তাবে রাজি করিয়েছে। ছুটিতে দেশে গেলেই গাঁটছড়া বাঁধবে। ছুটিটাই পাচ্ছে না বেচারিরা। মেয়েটা আজকে বোধহয় মৌরলা মাছের চচ্চড়ি এনেছে। গোটা অফিসে আঁশটে গন্ধ ম ম করছে। বিল্ডিং অ্যাডমিনিস্ত্রেশনের গ্যারি ম্যাক্লাস্কি কিছুক্ষণ আগেই মিস্তিরি নিয়ে এ’দিক সে’দিক ঘুরে দেখছিল। ওরা ভেবেছে গ্যাস লিক করেছে। গাধাগুলোকে চচ্চড়ি বোঝাতে গেলে আরেকটা সিভিল ওয়ার হয়ে যাবে।

নর্থ ক্যারোলিনার বিখ্যাত ব্যাঙ্কের আইটি সার্ভিসিং আউটসোর্স হয়েছে কলকাতার এক কুখ্যাত লেবার সরবরাহকারী কোম্পানির কাছে। সেই সূত্রেই এক ঝাঁক প্রতিভাধর বাঙ্গালীর জন্ম সার্থকতার সুযোগ লাভ এবং আমার সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণ। যেখানে তিনটে বঙ্গ সন্তান একত্রিত হলেই পলিটিক্যাল পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে আমরা সংখ্যায় দশের কাছাকাছি। প্রতি সপ্তাহে মাছের রেসিপির প্রতিযোগিতা হচ্ছে এ’বাড়ি ও’বাড়িতে। দুর্গাপূজা কমিটির প্রসব বেদনাও শুরু হয়ে গেছে। অথচ, আমার অবস্থা তথৈবচ। গিন্নিকে বুঝিয়ে পারি না যে আমি চিরকালীন পোড়া কপালী। বাকি সবাই রীতিমত গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমার ঘাড়ে চার চারটে প্রোজেক্টের জোয়াল। সপ্তাহান্তে ছুটি নিতে হলেও অনেক ওপরতলা থেকে অনুমতি নিতে হয়। বেশিরভাগ দিন অবশ্যি পারমিশন পাওয়া যায় না। একদিকে বাঁচোয়া। ঘুরতে যাওয়ার ঝামেলা নেই। কিন্তু আমার বউও নতুন। সে মানবে কেন? তার বদ্ধমূল ধারণা, আমার পাশের ডেস্কের বুড়ি শ্যানর আসলে পামেলা আন্ডারসন। তার অমোঘ আকর্ষণেই নাকি আমি রোজ অফিস যাই। ঘর থেকে বেরনোর সময় কপালে সাধক মহাপুরুষদের ছবি ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে কি সব মন্ত্র পড়ে। কাল্পনিক সুন্দরীর গাড়ির চাকায় একটা দুটো পেরেক ফুটলে শান্তি পাবে মনে হয়। খেয়াল হল আজকে তাড়াহুড়োয় সেই পেন্নামটা বাদ পড়ে গেছে। গৃহিণীর বদ অভ্যাস নিয়ে ঠাট্টা করলে কি হয় আজকে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

আমার শুকনো মুখ দেখে তমশ্রী ইশারায় জানতে চাইলো কিছু গোলমাল হয়েছে নাকি। আমি অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। আমার বিপদ শুনে তোর কি হবে? থাক তুই হবু বরকে নিয়ে। আমার কৃতকর্মের কথা ছড়িয়ে পড়লেই এমনিতেই সব বন্ধুত্ব মায়া হয়ে যাবে। উপল ধুমপানের শেষে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় পিঠে এক চাপড় মেরে বলল, “কিরে? এমন ছটফট করছিস কেন? পটি পেয়েছে তো ওয়াশরুমে যা।”

বাংলা ভাষায় হাসি মজাক এখানে এক্কেবারে নিষিদ্ধ। মনিবেরা আমাদের খুশি থাকার কারণ বুঝতে না পারলে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে। কোম্পানির মাথারা নালিশ পেয়ে সোজা চলে আসে অকুস্থলে। ছোট কনফারেন্স রুমে বন্দি করে এক ঘণ্টা ধরে বক্তৃতা ঝাড়ে, কি করে আরও প্রফেশনাল, আরও উন্নত দাস হওয়া যায়। বিদেশীদের কর্ণকুহরে তামিল, তেলুগু সুধা বর্ষণ করলেও বাংলা নৈব নৈব চ। এতগুলো বাঙ্গালী এক বিল্ডিংয়ে আছি বলে এমনিতেই দক্ষিণই দাদাদের শিরঃপীড়ার শেষ নেই। তাই সুযোগ পেলেই ক্লাস নিতে ভোলে না। মিটিঙয়ে সমুদ্রদা ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাতে থাকে এক কোণায় দাঁড়িয়ে। চচ্চড়িতেই ওর মেরুদণ্ডটা গেছে। তবে একমাত্র উপলটাই চালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছে। ওর মধ্যে বেশ বিদ্রোহী কবি ভাব আছে। অবাঙ্গালীদের সামনে বাংলা বলে আর আমাদের সাথে ইংরাজি বা হিন্দি। যাইহোক, ওকেও উপেক্ষা করলাম। আমার লাঙল আমাকেই বইতে হবে।

কি ব্যাপার র‍্যাট? এখানে কি মনে করে?”

নাঃ, ব্রুক্‌স আমায় ইঁদুর বলে গালাগালি দেয়নি। যুক্তাক্ষর এদের দাঁতে ধরে না। তাই, পিতৃদত্ত রতিকান্ত নাম এরা ছোট করার দু’রকম অপশন দিয়েছিল। হয় নামের প্রথম ভাগ ওড়াবে নয়তো দ্বিতীয় ভাগ। প্রথম ভাগ সরে গেলে বাকিটা যাচ্ছেতাই রকমের বাজে শোনায় দেখে আমি নিজেই “র‍্যাট” হতে রাজি হয়েছি। যাকগে, এই ঘটোৎকচের সামনে আমরা সকলেই ইঁদুর। এমনকি আমাদের পেটমোটা ভার্টিক্যাল হেড পদ্মনাভনও যার আদরের নাম “পাদু”।

একটা বিরাট গোলমাল হয়েছে ব্রুক্‌স…”

গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের অন্তরাত্মা শুদ্ধ করার প্রয়াস করলাম। দারুণ গুরুত্বপূর্ণ কথা পেটের ভিতরে চেপে রাখলে গ্যাস হয়ে যায়। ইতিমধ্যেই চোঁয়া ঢেঁকুর উঠবো উঠবো করছে। কলকাতা হলে তুলেই ফেলতাম। নেহাত দেশের নাম ডোবাতে চাই না বলে লজ্জাশরম করছি।

না না র‍্যাট। কোনো অজুহাত চলবে না। প্রতি সপ্তাহে তুমি একই ঘ্যানঘ্যানানি করো। পাদুকে বলাই আছে, তোমার রোলে উইকএন্ড বলে কিছু নেই। শনি, রবি কোথাও ঘুরতে গেলে যাও। কিন্তু মাথায় রেখো পাঁচ মিনিটের নোটিসে অনলাইন হতে হবে। যদি না হও, সোজা তোমার বসের কাছে ফোন যাবে।“

মশা তাড়ানোর ভঙ্গিমায় ব্রুক্‌স কথাগুলো বলল। মনে মনে নিজেকে যথেচ্ছ শাপশাপান্ত করলাম। এর চেয়ে দেশে ইলেকট্রিক সাপ্লাই অফিসে কাজ করলে অনেক বেশি রোয়াব থাকতো। দিনে আট ঘণ্টার এক মিনিট ওপারে গেলেই বোতাম টিপে লোডশেডিং করে দিতাম। কর্পোরেট আইটির জোয়ারে ভেসে যবনের হাতে পড়েছি। খানা খাওয়ার মূল্য চোকাতেই হবে। লোকটাকে ঠাসিয়ে চড় মারার কল্পনাও করতে পারছি না শান্তিতে। এতো উঁচুতে গাল।

সে’রকম কিছু নয়। আসলে বলছিলাম…”

আমার করুণ স্বর আবার ব্যাঘাত ঘটাল ব্রুক্‌সের রোম্যান্সে। অতিষ্ঠ হয়ে ঠকাস্‌ করে ফোন রেখে আমার দিকে ঘুরে বসলো। চাহুনিতে অসম্ভব বিরক্তি। বলল, “র‍্যাট তোমায় গতকাল যে কাজ দিয়েছিলাম হয়েছে? আজ সকালের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। এখানে সময় নষ্ট করছ কেন?”

হতচ্ছাড়া গতকাল রাত দশটায় আমায় আচমকা ফোন করে নতুন প্রোজেক্টের দায়িত্ব দিয়েছে। মিশেল, যার হাতে কাজটা ছিল, সে নাকি বিনা নোটিশে ম্যাটারনিটি লিভে চলে গেছে। ম্যাটারনিটি লিভ বিনা নোটিশে কি করে হয় তা মা ষষ্ঠীই জানেন। রাত বিরেতেই ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে গেছিলো ব্যাঙ্কে। ব্রুক্‌সের শুভানুধ্যায়ী পাদু আর সমুদ্রদা আগবারিয়ে বলেছিল, “চিন্তা কি? র‍্যাট আছে তো। ওকে বললেই সামনে নেবে।“ ওমনি কাহিনীর আগাপাশতলা না জেনেই আমি হয়ে গেলাম এক্সপার্ট। রাতভোর জেগে চালাতে হল জব। তাতেও পরিত্রান নেই। আজ পাঁচ মিনিট দেরিতে অফিসে ঢোকার জন্যে ইতিমধ্যেই পাদু বাঙ্গালীদের সময়জ্ঞানের অভাবের ওপরে প্রবন্ধ লিখে সোয়া ঘণ্টা খেয়ে গেছে। সম্রাট শশাঙ্ককের জমানা হলে এক্ষুনি দক্ষিণ ভারত দখলের অভিযান চালানোর পরামর্শ দিতাম। হায়রে গৌড় বঙ্গ!

ওই ব্যাপারেই কথা ছিল,” আমি আমতা-আমতা করে বললাম। “একটা ছোট ভুল হয়ে গেছে।“

ব্রুক্‌স পায়ের ওপরে পা তুলে বসল। ডান হাতে মোবাইল। এক্ষুনি পাদুর কাছে আমার নামে নালিশ যাবে। কি ভুল করেছি জানলেই ফটাফট টাইপ করে ফেলবে। করিৎকর্মা লোক। কোনো কাজে দেরী করে না।

শ্রোতার মধ্যে যৎসামান্য হলেও আগ্রহ জাগাতে পেরেছি দেখে আমি পরবর্তী সংবাদ দিলাম, “ভুল করে ডেটাবেসের টেবিল ড্রপ করে ফেলেছি। কাস্টোমার ইন্‌ফর্‌মেশন টেবিল।“

কোথায়?”

আজ্ঞে, প্রোডাক্‌শনে।“

হা হা হা, ইউ আর ফানি র‍্যাট। ইয়ার্কি করার আর সময় পেলে না।“

সত্যি বলছি ব্রুক্‌স। বিশ্বাস কর। এতো কাজের চাপে ভুল হয়ে গেছে।“

আমাদের বাদামী মুখে সত্যি বৈচিত্রের বড়ই অভাব। খুব রেগে গেলে বা লজ্জা পেলে বড়জোর কান লাল হয়। সেখানে ফিরিঙ্গীদের চেহারায় ঋতু পরিবর্তন খুবই অসামান্য ভাবে প্রকাশ পায়। বিপদের ঘনত্ব টের পেতেই ব্রুক্‌সের মুখে অরোরা বেরিয়ালিসের বর্ণচ্ছটা খেলে গেলো। শেষ পর্যন্ত রাঙা মুলোর রঙ ধারণ করে ব্রুক্‌স “পাদু পাদু” ডাক ছেড়ে উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে কিউব পরিত্যাগ করলো।

যেরকম ভূমিকম্পের আশঙ্কা করেছিলাম তার চেয়েও কয়েক স্কেল ওপর থেকে কাঁপুনি শুরু হল ফ্লোর জুড়ে। দাঁড়িয়ে থেকে দেশি বিদেশী বড়কর্তাদের রক্ত চক্ষু নিয়ে প্রবল ছোটাছুটি পর্যবেক্ষণে আমি খুব একটা সুরক্ষিত বোধ করলাম না। আমার দিকে ওদের রুক্ষ দৃষ্টিপাতে মনে হচ্ছিলো নর্থ কোরিয়ার জায়গীর আমিই পেয়েছি। মাথা নিচু করে সিটে চলে এলাম। সেখানে অনেকেই উঁকিঝুঁকি মেরে দেখে গেলো, কে সেই ইঁদুর যে ব্যাঙ্কের কাস্টোমার ডেটাবেস টেবিল উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্ডারগার্টেনে যেমন হেড ডাউন করে থাকতাম তেমনই ঘাড় গুঁজে বসলাম। উপল আর তমশ্রী সান্ত্বনা দিতে এসে বলল, “দেখিস একদিন এই বাজে সময়টা কেটে যাবে। তখন ভাবলে বরং মজা পাবি।“

কিন্তু চাইলেই কি আর শক্ত থাকা যায়। বিশেষত যখন কানে এলো পাদু এবং সমুদ্রদার গুরুতর আলোচনা, কিভাবে আমায় পত্রপাঠ ছাঁটাই করে ক্লায়েন্টকে খুশি রাখা যায়। ওরা কেউ একবার মুখ ফুটেও বলল না, আহারে, ছেলেটা কয়েক মাস টানা রাত দিন কাজ করছে। মানুষের ব্রেকিং পয়েন্ট তো থাকেই। অথবা ভুল সবারই হয়। ইঞ্জিয়ারিং কলেজ হস্টেলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ র‍্যাগিংয়ের রগড়ানি খেয়েছি নির্বিকার চিত্তে। কর্পোরেট র‍্যাগিংয়ে মাত্র চল্লিশ মিনিটে আত্মবিশ্বাস তলানিতে পৌঁছে গেলো। দিনের শেষে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম, আগামীকালই হয়তো আমায় বরখাস্ত করা হবে। ভারতের প্রিমিয়ার কোম্পানি একজনকে দিয়ে নির্দ্বিধায় চারজনের কাজ করাতে পারে, কিন্তু ভুল ক্ষমা করে না। নইলে ভিনদেশী ক্লায়েন্ট ভাববে কি?

পরের দিন মহাপুরুষদের ছবি একশবার মাথায় ঠেকিয়ে অফিসে গেলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য, সব চুপচাপ। গতকালের ঘটনা নিয়ে কেউ কোনো উচ্চবাচ্যই করছে না। যে যার কাজ করে চলেছে যেন কিছুই হয়নি। ব্রুক্‌সের মুখ আজকে টমেটোর কাছাকাছি রঙ নিয়েছে তাই ওকে আর ঘাঁটালাম না। কার কাছে ওয়েদার রিপোর্ট জানতে চাইব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তখনই তমশ্রী এলো আমার ডেস্কে। ওকে বললাম, “হ্যাঁরে, এরা আমায় কখন তাড়াবে কিছু জানলি? সমুদ্রদা কিছু বলেছে?”

তোকে কখন তাড়াবে জানি না। তবে ব্রুক্‌সের আজই শেষ দিন এখানে,” তমশ্রী বলল।

সেকি? লোকটা বড্ড অভিমানী দেখছি। আমি টেবিল ড্রপ করেছি বলে এতো দুঃখ পেয়েছে?” আমি পুরো হতভম্ব।

তুই কার আইডি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে কাজ করছিলি কাল?”

হুম সেতো জানি না। আমায় আগের দিন যখন কাজ দিলো, আমি বললাম আমার অ্যাক্সেস নেই সিস্টেমে। ব্রুক্‌স বলল নতুন অ্যাক্সেস বানাতে সময় লাগবে। আজ রাতেই সব কাজ চাই। তাই একটা ইউজার আইডি আর পাসওয়ার্ড দিয়ে দিলো,“ আমি মনে করে বললাম।

নিজের সিক্যুরিটি ক্রিডেনশিয়াল অন্যের সাথে শেয়ার করা ডেটাবেসে টেবিল সরিয়ে দেওয়ার থেকেও গর্হিত অপরাধ। ডেটাবেসের তো ব্যাকআপ থাকে। সেখান থেকে হারানো তথ্য ফিরিয়ে আনতে দুএকদিন সময় লাগবে। কিন্তু ব্রুক্‌স ব্যাঙ্কের পলিসি ভেঙ্গেছে। তাই ইমিডিয়েট টার্মিনেশন।“

সাহেব যতই অত্যাচারী হোক, আমার দোষে ও সাজা পাবে সেটা ঠিক মানতে পারলাম না। আমি পাদুর  কাছে সোজাসুজি জানতে চাইলাম, “কালকের ভুলের শাস্তি যা চাও দিতে পারো। যদি ছাঁটাই করবে ভাবো তাহলে দয়া করে বলে দিও। প্রস্তুতি নিতে হবে সেই ভাবে।”

পাদু গুরুগম্ভীর হয়ে বলল, “ব্রুকস বেরিয়ে যাচ্ছে শুনেছ নিশ্চয়ই। মিশেল ম্যাটারনিটি লিভ থেকে না ফেরা পর্যন্ত তুমি ছাড়া কেউ নেই যে প্রজেক্টটা সামলাতে পারবে। যা হওয়ার হয়ে গেছে। নিজের কাজ আরম্ভ করে দাও। আমারই ভুল। কলকাতার বদলে চেন্নাই থেকে কাউকে আনলে এমন জ্বালাতন হত না।”

এরপরে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওরা আমার ওপরে চাপিয়ে দিলো আরও অনেক, অনেক কাজ। দম ফেলার সময় পর্যন্ত নেই। মুনাফার লোভে শোষণকে অভ্যসে পরিণত করলো সবাই মিলে। কোম্পানির উঁচু নিচু সকলকে বার্ন আউট হয়ে যাওয়ার এসওএস পাঠিয়েও বিচার পাওয়া গেলো না। অতএব হাসিমুখে মেনে নেওয়া শুরু করলাম। সব কাজ করলাম আমি একাই। নিলাম না কারো সাহায্য। তৈরি হল না আমার কোনো পরিবর্ত। এইভাবে মাস খানেক চলার পরে পাদু গরমের ছুটিতে যাওয়ার আগের দিন ওকে দিলাম আমার রেজিগ্‌নেশন নোটিশ। ওর মুখের অবস্থা হয়েছিল দেখার মত। পাঁচটা প্রজেক্ট একসাথে বন্ধ হওয়ার যন্ত্রণা কি কম নাকি? আমি হাসি চেপে রাখতে পারিনি। দেশের মহামূল্যবান আইটি সার্ভিসের অত্যাধুনিক দাসত্ব প্রথার বিরুদ্ধে আমার প্রথম প্রতিবাদ সর্বান্তকরণে সফল। তারপরে কখনও আর কোনো ব্রুক্‌স বা পাদুকে মাথায় চড়ার সুযোগ দেইনি। হু হু বাবা, বাঙ্গালী ইঞ্জিয়াররা জীবনে ভুল একবারই করে। নেড়া আর বেলতলা মনে আছে?

সুর বনে হমারা


 ‘কি র‍্যা? কোথায় তেরা গ্লেসিয়ার?’ বাবা বাংলা হিন্দির অদ্ভুত মিশ্রণে জিজ্ঞাসা করলো ঘোড়াওয়ালাকে। বাবার ঘোড়ার কয়েক হাত পরেই হেলে-দুলে চলছে আমারটা। চাচা আর ভাতিজা, দু’জনে আমাদের পাশে লাগাম ধরে হাঁটছে। পাহাড়ের গায়ে কোথাও বরফের চিহ্ন মাত্র দেখা যাচ্ছে না। গ্লেসিয়ার এখানে কিভাবে আবির্ভাব হবে? বাবা’কে দেখলাম, সাথের নীল ছোট হাতব্যাগ বুকের কাছে চেপে ধরেছে। ওটাতে ক্যাশ টাকা তোলা থাকে, প্রতিদিনের খরচার জন্য। কলকাতা হলে, নভিস পকেটমাররাই চোখ বন্ধ করে ফাঁকা করে দিত সেটা এতদিনে। তবে বাবা’র বিশ্বাস, দেশের বাকি লোকেরা এখনও অতটা বখে যায়নি। সুতরাং, ঘুরতে গেলে নীল ব্যাগ বাবার সর্বক্ষণের সঙ্গী।

‘হেই থোরা অউর আগে,’ চাচা হাতের ইশারায় আরও ওপরের দিকে দেখাল। তারপরে, আমাদের অধৈর্য ভাব কাটাতে দূরের পাহাড় চূড়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘উধার হ্যায় হমারা পোস্ট। উস্‌পার পাকিস্তানি আর্মি’। আমি ব্যস্তসমস্ত হয়ে চোখে দূরবীন লাগিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম দেশের সীমানা। আকাশছোঁয়া পাথুরে পাহাড় ছাড়া কিছুই নজরে এলো না। বস্তুত রুক্ষ শিলাময় মরুভূমিতে আমরা ছাড়া প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই।

‘খুব ভুল হয়ে গেছে বুঝলি। এদের সাথে না এলেই হত,’ বাবা ঘাড় ঘুরিয়ে, বিশুদ্ধ বাংলায় বলল। কথাটা যে আমার মাথায়ও আসেনি তা নয়। এতো আর যেমন তেমন যায়গা নয়। একেবারে কাশ্মীর। যেকোনো মুহূর্তেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গুলমার্গে গন্‌ডোলা রাইড নিয়ে কংডুরি স্টেশনে পৌঁছে জেনেছিলাম দ্বিতীয় ধাপের রোপওয়ে যান্ত্রিক গোলযোগে বিকল। বরফ না পেয়ে আমরা তো খুব হতাশ। তখনই, ঘোড়াওয়ালারা এসে হাজির হয়। কাছেই নাকি গ্লেসিয়ার। হাজার টাকায় ঘুরিয়ে আনবে। মা কিছুতেই রাজি হল না, তাই আমরাই চলে এলাম। কিন্তু মিনিট পনেরো হয়ে গেলো, জনশুন্য চড়াই ধরে উদ্দেশ্যহীন ভাবে চলেছি। এদের যদি বদ মতলব থাকে, তাহলে প্রাণ নিয়েও টানাটানি হতে পারে। পুলিশ বা আর্মির কেউই এখানে নেই বাঁচানোর জন্য।

‘ইধর থা গ্লেসিয়ার,’ দুটো পাহাড়ের মাঝে একটা খাদের কাছে এনে ঘোড়া দাঁড় করাল চাচা।

‘থা হয়ে গেল ক্যায়সে? শুরুমে তো নহি বোলাথা কি গ্লেসিয়ার থা?’ বাবা খুব ক্ষেপে গেল চাচা’র ওপরে। খুবই স্বাভাবিক। হিমবাহের চিহ্নমাত্র নেই সেখানে। সোজাসাপটা টুপি পরানো একেই বলে।

‘যল্‌যলা মে টুট্‌ গেয়া,’ চাচা ভাবলেশহীন হয়ে বলল। যল্‌যলা মানে ভূমিকম্প সেটা ততদিনে শিখে গেছি। পুজোতে কাশ্মীর ঘুরতে এসে নিত্যদিনের রোমাঞ্চের সাথে কিছু নতুন শব্দের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছে।

ইতিমধ্যে কোত্থেকে এক বুড়ো চা’ওয়ালা এসে আমাদেরকে দুটো গরম কাশ্মীরি চায়ের মগ ধরিয়ে গেল। দেখতে পেলাম, একটা বিরাট পাথরের চাঁইয়ের পিছনেই ওঁর উনুন। দূর থেকে বোঝার উপায় নেই। বুঝলাম, ইনিও ঘোড়াওয়ালার আত্মীয় কুটুম। ওদের সাথে গ্লেসিয়ার দেখতে এলে চা’ও খেতেই হবে। এই দুর্গম যায়গায় না বলার আস্পর্ধা দেখানো একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

গরম চা আর মশলা রুটি নিয়ে আমরা উনুনের পাশে বসলাম। দাদাজি ভাঙ্গা হিন্দিতে সুখ-দুঃখের গল্প করা শুরু করলো বাবার সাথে। আমি সতর্ক চোখ রাখলাম ঘোড়ার সহিসদের ওপরে। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে কিছু একটা গোলমাল হবেই। দাড়িওয়ালা লোকগুলো এক্ষুনি হয়তো ফিরানের ভিতর থেকে বের করে আনবে কালাশনিকভ।

তেমন কিছু হল না। রুটি আর চা’এর দাম চাইলো আড়াইশো টাকা। একেবারে বাটপাড়ি। কিন্তু, বাবা উল্টে পাঁচশো টাকা দিয়ে দিল। আমি ইঙ্গিতে বারণ করেছিলাম। কিন্তু বাবা না দেখার ভান করে রইলো। গন্‌ডোলা স্টেশনে যখন ফেরত এলাম, মা দুশ্চিন্তায় অস্থির। সুযোগ পেয়ে বাবা’কে চেপে ধরলাম। ‘কেন তুমি বেশি টাকা দিলে?’

‘শুনিসনি? ওরা বারবার বলছিল, পাহাড়ের ওপরে হামারা পোস্ট। ভ্যালিতে পা দেওয়ার পর প্রথমবার কারো কাছে হমারা শুনে এতো আনন্দ হল…’।।   

এক গোলী, এক দুশমন


 আকাশচুম্বী ডালগুলো থেকে ফোঁটা-ফোঁটা ঝরে পড়া জল টুপ-টাপ শব্দের ছন্দময় সঙ্গীত তৈরি করেছে। কোনো অদৃশ্য পরিচালকের হাতের ইশারায় যেন আলোড়ন পৌঁছে যাচ্ছে পাতা থেকে পাতায় পাখিদের কিচির-মিচির জানান দিচ্ছে আসন্ন দিনান্তের। ঘিরে থাকা গাছের গুঁড়িগুলোয় ক্রমশ ঘন হয়ে আসা অন্ধকার, ফিস-ফিস করে বলছে, হাতে সময় নেই। পিস্তল পিছনে গুঁজে নরম মাটিতে হাঁটু গেড়ে বঅঙ্কন। ক্ষিপ্র হাতে শেওলার ভিড় সরিয়ে খোঁজার চেষ্টা করল পায়ের ছাপ। মিনিট দশেক আগে, নালা পেরোনোর সময় বিলাওরের পা লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েছিল সে। এখনও ভেজা মাটির গন্ধে মিশে আছে সেই বারুদের ছোঁয়া। কান ফাটানো আওয়াজ ছোট্ট নালার কুল-কুল শব্দকে ছাপিয়ে সৃষ্টি করেছিল প্রতিধ্বনিঅঙ্কন নিশ্চিত, বিহড়ের ত্রাস আহত। কিন্তু কোথায় লুকাল লোকটা?  

হঠাৎ করবী গোড়ায় লালের ছিটেতে চোখ আটকে গেল তার। গুড়ি মেরে কাছে যেতে বুঝল, দাগ পুরনো নয়ট্র্যাকার হিসেবে অঙ্কনের জুড়ি মেলা ভার। ঠিক পথেই এগোচ্ছে সে। কনুইয়ে ভর করে কিছুদূর এগোতেই দেখতে পেল রক্তাক্ত বিলাওরকে। এক পুরনো মন্দিরের চাতালে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। মহেন্দ্রগড়ে শান্তি ফিরল তাহলে অবশেষে।

একি কাণ্ড? তুলসি তলায় আলতা ঢেলে একাকার করেছে ছেলেটা! সারা গায়ে কাদা মেখে ভূত …”

মা বাইরে এসেই তুলকালাম শুরু করলোসুপারম্যান উরফ্‌ বিলাওরকে কুড়িয়ে পিছনে ফিরল অঙ্কন। দেখল, সাধের বাগানের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। জল দেওয়ার ড্রেন ডিঙ্গিয়ে আসতে গিয়ে বেশ কয়েকটা টব উল্টেছে। দুটো গাঁদা গাছ কুপোকাত হামাগুড়ির ঠেলায়। ডালিয়ার ডাল ভেঙ্গে রয়েছে করবীর পাশে। ইনস্পেক্টর অঙ্কনের আজকের অভিযান নিঃসন্দেহে ছিল রোমাঞ্চকর। প্যান্টুলে খোঁচা মারছে বিশ্বস্ত ক্যাপ পিস্তল। পরের পুজোর এখনও ঢের দেরি মেপে বুঝে দিনে একটা ক্যাপ ফাটায় সেতাই, চম্বলে ডাকু শিকারে অঙ্কনের মূল মন্ত্র এক গোলী, এক দুশমন

বৃষ্টি ধোয়া

 


শাওন ধারা, ছুটির তাড়া,

হাজার রকম ছুতো,

যুক্তি বাঁধন, আলগা শাসন,

ঝপাং ভেজে জুতো।

দরজা গ্রিলে, অথৈ ঝিলে,

টুপটাপ ঝরে ঘ্রাণ,

কাগজ ভেলা, নৌকো খেলা,

উদাস মেঠো প্রাণ।

মাটির গন্ধ, জলের ছন্দ,

নিষেধ মানা ভুলে,

আমার বাদর, মেঘলা চাদর,

কুড়নো কদম ফুলে।

সিক্ত পাতা, হারানো ছাতা,

দুকূল ভাঙ্গা ঝোঁকে,

শপথ করে, আঁজলা ভরে,

সে’ফুল দিলাম তোকে।

আকাশ কালো, ঝাপসা আলো,

বন্ধু হওয়ার কারণ,

আঙ্গুল ছোঁয়া, বৃষ্টি ধোয়া,

            প্রেমে পড়া বারণ।।

প্লাবন


 

হঠাৎ সেদিন, আষাঢ় রাতে,

ঠিক বেঠিকের মোড়ে,

তোমার আমার, গল্পটাতে,

বর্ষা এল জোরে।

এক ছাতাতে, দুকূল প্লাবন,

দূরত্ব রয় মেপে।

সিক্ত শরীর, পিচ্ছিল মন,

বাদল ফোঁটা লেপে।

পাগল ঝড়ের হাতছানিতে,

চোখের কোণে ধাঁধা,

উল্টে দেখি কালির দোয়াত,

লেখার খাতা সাদা।।

ভূতে বাঙ্গালী

 


বাঙ্গালী ভূতেরা সংকটে বড়, চৌপাট যত কারবার,

বুর্জোয়া দের দুর্বুদ্ধি তে, পাত্তা পায়না কেউ আর।

পশ্চিমি সব ঢঙের গুঁতোয়, ব্রহ্ম দত্যি ঘর ছাড়া,

বটতলাটা ফাঁকাই থাকে, জম্বির কাছে খেয়ে তাড়া।

ড্রাকুলারই শুধু নাম ডাক, মামদোর কথা কে ভাবে?

পেত্নীটারও মন ভাল নেই, বাজার খারাপ যে ভাবে।

তার ওপরে লক-ডাউন, প্ল্যানচেট ও হয় ভার্চুয়াল,

নেটফ্লিক্সে নেকড়ে মানুষ, নিশির ডাকে নেই খেয়াল।

গেছো ভূতটা বেকার বসে, শ্যাওড়ার ডালে ঘুম ঘুম,

স্কন্ধকাটার গ্যাস অম্বলে, মাথা ধড়ে চলে হাম তুম।

কানাভুলোটা ইকনমি বোঝে, সারভাইভাল কি জিনিস,

হানাবাড়িতে দেওয়াল লিখন, পুঁজিবাদ কে কর্‌ ফিনিশ।

প্যাঁচাপেঁচি বেশ চালাক চতুর, ইংরাজি তে মন্দ নয়,

দানব মোড়ে খুলছে কলেজ, ভূত শিল্পে বাড়াতে ভয়।

বেঁশো ভূতের কোচিং ক্লাসে, খুব ভিড় তাই রাত ভোর,

ব্রাউজিং স্কিল আবশ্যিক, অশরীরী ভাষায় চাই জোর।

আগের মতন বইয়ের পাতায়, লুকনো ভয়ে হবে না,

শাঁখচুন্নির খ্যানখ্যানে হাসি, ই-বুকে ঠিক খাবে না।

ফেবু গ্রুপে ভয়ের ইভেন্ট, যোগ দিয়ে আজ মেম্বারে,

গোগ্রাসে সব পড়ছে পাঠ্য, বেঘো দাদার চেম্বারে।

আর কদিনেই দেখতে পাবে, ভূত শিক্ষার ফলাফল,

ঘর ওয়াপ্সি করবে ভয়ে, বাঙ্গালী ভূতের দলবল।।

অভিমানে সুখী

 


যমুনার জলে, গোপিনীর দলে,

আমিও ছিলেম মিশে,

তুমি অবহেলে, অখাত সলিলে,

তৃষ্ণা মেটালে বিষে।

প্রেমের গরল, অবুঝ সরল,

কালিমা লেপেছে লোকে,

স্খলিত চরণ, আমার মরণ,

দেখেছি কাজল চোখে।

ডাকাতিয়া বাঁশি, বিমোহিত হাসি,

হাতছানি দিয়ে কাছে,

আমায় শুধোলে, অচ্যুত ছলে,

বিনোদিনী ঘরে আছে?

তুমি হৃষীকেশা, মায়াময় নেশা,

শ্রীমতী ব্যাকুল চেয়ে,

আমি পোড়ামুখী, অভিমানে সুখী,

কথার পরশ পেয়ে।

তটিনীর চরে, হাজার বছরে,

নিশ্চয়ই দেখা হবে,

সেদিন মুরারি, ভুলে একবারই,

আমায় রাধিকা কবে?


ভালোবাসার পুজো

 


সেদিন ভোরে, জানালা ধরে,

মিষ্টি করে হেসে,

নিকোনো উঠোন, দুব্বো ঘাসে,

স্বপ্ন এসে মেশে

চড়ুই পাখির কিচির মিচির,

ঝরা শিউলির ঝাঁক,

কুমোর পাড়ার কলসি হাড়ি,

পেরিয়ে পথের বাঁক।

পায়ের পাতায় কাদা মাটি,

ছন্দে ঢাকের তাল,

তোমার ঠোঁটে সরল খুশী,

শিশির ভেজা গাল।

দীঘির পাড়ে ব্যস্ত সবাই,

তুমিও তাদের দলে,

লুকিয়ে দেখা পড়ল ধরা,

চোখ হারানোর ছলে।

তখন আকাশ পেঁজা তুলো,

কলাবউ এর স্নান,

আমার বুকে টাপুর টুপুর,

নদে এলো বান।


উইন্টার গেম


 ‘ছেলেটা এতক্ষণে কতদূর গেছে বলে তোমার ধারণা?’, মিশেল ফিস্‌ফিসিয়ে জানতে চাইলো।

‘ওর যা অবস্থা, এই ওয়েদারে বেশিদূর নয়। বড়জোর, রাস্তার শেষে ওই জঙ্গলে’, ডেভিড হ্যারিকেন উঁচিয়ে ঠাহর করলো বরফের মধ্যে পায়ের চিহ্ন। প্রবল তুষার ঝড় চলছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ছাপগুলো ঢেকে যাবে নতুন গুঁড়ো বরফের কুচিতে।

‘ডার্লিং, তুমি আবার আলো ফেলছ কেন?’, স্ত্রীর গলায় কৃত্রিম অনুযোগ, ‘প্রতিবেশীদের অসুবিধে হবে তো’।

মিশেল প্লিজ!’, ডেভিড বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তাঁদের কিছু যায় আসে না আর’।

‘আহা, রাগছ কেন? মাঝে মধ্যে ভাবতে মন্দ লাগে না যে ওরা সবাই আছে’।

কৌতুক উপেক্ষা করে ডেভিড চোখ বুঁজে বাতাসের ঘ্রাণ নিল। বলল, ‘মাইল দেড়েক হবে। মেডোর শেষে, সিলভার বার্চের আড়ালে গুটিসুটি মেরে আছে’।


‘ইশ, বেচারা আর কত কষ্ট পাবে। এবারে শুরু করি চল’, মিশেলের কষ বেয়ে রক্তের ধারা। স্বদন্তে অবাধ্য হাসি। চোখে প্রিয় খেলার চাপা উত্তেজনা। মানুষ শিকারের চেয়ে বেশি মজা আর কিছুতে নেই।

‘পুওর চার্লস’, আস্তিনে ঠোঁট মুছে তৈরি হল ডেভিড। এবারের রেসে মিশেল’কে হারাতেই হবে।।

মূল্যায়ন


 ‘স্যার, আমার ছবি খুঁজে পাচ্ছি না’।

অভিজিত কাজ থেকে চোখ তুলে তাকালেন। শ্যামলা, ছোট-খাট গড়নের ছেলেটা ছলছল চোখে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। ওর নাম শঙ্কর। পদবী মনে পড়ল না। দিন সাতেক আগে প্রথম দেখেছিলেন বোধহয়। এবারে তিনি নিজের ছবির সাথে কিছু নতুন শিল্পীর আঁকা নিয়ে প্রদর্শনী করছেন। নতুন প্রতিভা দের নির্বাচন করেছেন রিয়্যালিটি শো এর মাধ্যমে। গোটা রাজ্যে রীতিমত সাড়া পড়ে গেছিল। অভিজিতের ছবি লন্ডনের ফাইন আর্টস মিউজিয়ামের শোভা বর্ধন করছে। এহেন প্রথিতযশা চিত্রকরের সৃষ্টি সমূহের সাথে এক্সিবিশন রুম ভাগ করে নেওয়ার সৌভাগ্য লাভের আশায় অনেকেই হাজির হয়েছিল। ঝাড়াই বাছাই করে তাদের মধ্যে থেকে তিন জনের ছবি পছন্দ করেছেন অভিজিত। না, শঙ্কর তাদের মধ্যে ছিল না। ওকে তাঁর কাছে নিয়ে এসেছিল রুমেলা। বারবার অনুরোধ করেছিল প্রতিভাধর গরীব ছেলেটিকে সুযোগ দেওয়ার জন্যে। অভিজিত, প্রিয় ছাত্রী সুন্দরী রুমেলার কথা ফেলতে চাননি। শঙ্করের পোর্টফলিও তে একবার চোখ বুলিয়েই আলগোছে একটা ছবির দিকে তর্জনী তুলেছিলেন। কি ছিল তাতে? নাহ্‌, মনে পড়ছে না। কিন্তু একাডেমী থেকে চুরির অভিযোগ সহজ কথা নয়।

খুব বিরক্ত হয়ে আসন ছেড়ে উঠলেন অভিজিত। কিছুক্ষণ আগেই, পথশিশু দের ওপরে বানানো তাঁর ‘ফিনিক্স অফ বেঙ্গল’ ছবি টা পঁচিশ লক্ষ টাকার চেক দিয়ে বুকিং করে গেলেন ভারতের বিখ্যাত ইন্ডাস্ট্রি হাউসের মালকিন অলকা জালান। গত দু’দিনে এ’রকম আরও ছ’টা কাজ বিক্রি হয়েছে। প্রদর্শনীর প্রবেশ মূল্যই যেখানে কয়েক হাজার টাকার ওপরে সেখানে সাধারণ চোর ছ্যাঁচোড় তো আসবেই না।

‘আপনার ছবির গুনতি সব ঠিক আছে স্যার’, ইভেন্ট ম্যানেজার তমাল হন্তদন্ত হয়ে এসে খবর দিল। অভিজিতের ছবি এদিক থেকে ওদিক হলে এখুনি বিরাট ঝামেলা হয়ে যাবে। পুলিশ তো জড়াবেই, এমনকি সিবিআই ও ঢুঁ মারতে পারে।

‘কোথায় ছিল তোমার মোনালিসা?’, অভিজিত প্রশ্নে তাচ্ছিল্যের ভাব লুকালেন না।

‘এই যে স্যার, এদিকে’, শঙ্কর অর্ধ-বৃত্তাকার ঘরটির বাম হাতের সীমানার কাছে এগিয়ে গেল। এখানেই দেওয়ালে টাঙ্গানো রয়েছে অভিজিত রায়ের এখনও পর্যন্ত সেরা কাজ, ‘ইমারশন’। পিছনে দক্ষিনেশ্বরের কালি মন্দির কে রেখে হুগলী নদীতে প্রতিমা ভাসানের এক অদ্ভুত সুন্দর তেল চিত্র। তিনি নিজেই আবার মুগ্ধ হয়ে গেলেন।

‘এখানে টাঙ্গানো ছিল স্যার’।

অভিজিতের ছবি যেখানে শেষ হয়েছে তার পাশে একটা ছোট দেওয়ালে অপেক্ষাকৃত অবহেলায় নতুন শিল্পীদের আঁকা গুলো রয়েছে। তাদের মাঝখানেই শঙ্করের টাও ছিল। সব অ্যামেচার ব্রাশে ওয়ার্কের পাশে অভিজিতের ছবি, যেন ধারাভির বস্তিকে হেলায় ফেলে মাথা উঁচিয়ে থাকা অম্বানির প্রাসাদ। এই ছবির দাম অন্তত এক কোটি তো হওয়াই উচিত।

আবার শঙ্করের দিকে তাকালেন অভিজিত। ছেলেটার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। নিজের অসম্ভব পরিশ্রমের ফল কে এভাবে হারিয়ে যেতে দেখলে মন খারাপ তো হবেই।

‘শোনো, এত ভেঙ্গে পড়ো না। অভিজিত রায়ের এতগুলো ছবি ফেলে চোর যে শুধু তোমার টা নিয়ে গেছে, সেটাই অনেক বড় সম্মান’, শঙ্করের কাঁধে হাত রেখে তমাল বলল, ‘আঁকতে থাকো। স্যার তোমাকে আরও সুযোগ দেবেন ভবিষ্যতে’।

শঙ্করের মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে রিসেপশন ডেস্কে ফেরত এলেন অভিজিত। কপালে তাঁর বিন্দু-বিন্দু ঘাম। দিনের শুরুর ঘটনা গুলো মনে পড়ল। তমাল সাত সকালেই একাডেমী থেকে ফোন করে খবর দিয়েছিল। বিখ্যাত শিল্প বোদ্ধা স্যার গ্রেগরি রবিনসন, সারা বিশ্ব যার মূল্যায়ন এক কথায় মেনে নেয়, তিনি গতকাল প্রদর্শনীর একটা নতুন ছবির দাম ঠিক করেছেন প্রায় দু কোটি।  অচেনা কুঁড়ের দেউটি তে খেলতে থাকা শিশুদের নিয়ে আঁকা সেই আনকোরা আলেখ্য ম্লান করে দিয়েছে নাকি বাকি সব কিছুকে।

ছবিটাকে গোপনে সরিয়ে, ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখার পরামর্শ তমাল কে অভিজিত রায়ই দিয়েছিলেন।।

ঘুরে দাঁড়ানো

 


আইটি সেক্টর, আবার পার্সোনাল টাইমও চাই? ডেলিভারি কে দেখবে?’

সারাদিন ল্যাপটপে! সংসারের দিকেও তাকাও…’

আপনার কি বাঁচার ইচ্ছে নেই? বিপি, কোলেস্টেরল, সুগার সব একসাথে বাধিয়েছেন? অবিলম্বে সুস্থ জীবনে ফিরুন আর এই ওষুধগুলো নিয়মিত…’

কিরে? শিং ভেঙ্গে বাছুরের দলে শেষে?’

বাবা, তুমি ঠিক পারবে’, দর্শকাসনে বসা তিতলির ক্ষীণ স্বরে সম্বিৎ ফিরল

কপালের ঘামে চোখ ঝাপসা বুকের ধুকপুক রুদ্ধশ্বাস ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে

কাঠের বোর্ড ছফুটের মতন উচ্চতায় ধরে রেখেছেন সেন্সেই ডান পায়ে দুরন্ত স্পিনিং হুক কিকের এক আঘাতে দুটুকরো করতে হবে সেটা ব্ল্যাক বেল্টের পরীক্ষায় এটাই শেষ বাধা ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইতে মেয়ের হিরো আমি, চাপা গর্জনে নিজেকে নিংড়ে পা ছুঁড়লাম লক্ষ্যের দিকে।।

আমার খেলা যখন


পুরনো খড়খড়ি নামাতেই একটা তীক্ষ্ণ সোনালি ছটা ঝর্ণার গালে এসে পড়ল। আশিস ঝর্ণার থুতনি ছুঁয়ে ওর মুখ তুলে ধরল আলোতে। চোখের কোণে হীরের মতন চিকচিক করে ওঠা জলের ফোঁটা দুটো তাকে অনুভব করাল দুখী মেয়েটার অভিমানের ভার।

“আষাঢ় মেঘে রাখল ঢাকি, নাম যে তোমার কাজল আঁখি”, আশিস কাব্যি করে তর্জনী দিয়ে মুছে দিল অশ্রুবিন্দু। প্রেয়সীকে আরও নিবিড় করে দেখার আশায় জানালার পাল্লা খোলার জন্যে সে খুবই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। একতলায় সিঁড়ির ধারে জীর্ণ আসবাব ডাই করে রাখার ঘরটিতে ঝর্না আর হরুদাদা ছাড়া কারোরই পা রাখার সময় বা কারণ হয়না। পরিচর্যার অভাবে মরচে ধরা ছিটকিনি সশব্দে আপত্তি জানানো ব্যতীত আশিসের প্রয়াসে নির্বিকারই থাকল।

“তুমি পাগল হলে? লোকে জেনে যাবে তো”, ঝর্না তড়িঘড়ি আশিস কে নিবৃত্ত করল।

“কার এতো বড় সাহস রাজপ্রাসাদে উঁকি দেবে? দারোগা কাকু খুলি উড়িয়ে দেবে না?”, আলোআঁধারির মাঝে আশিসের কৌতুক উপেক্ষা করল ঝর্না। বদ্ধ ঘরে বাক্স প্যাঁটরার আড়ালে গত একমাস জীয়ন কাঠির মতন আগলে লুকিয়ে রেখেছে এই দাবানলের স্ফুলিঙ্গ কে। কি করে বোঝায়, তাকে হারানোর দুঃস্বপ্ন অহরাত্রি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তরুণীর ক্ষুদ্র প্রাণটাকে।  বিপ্লবের গভীর তত্ত্বকথা তার মাথায় ঢোকে না। হ্যারিকেনের কাঁপা আলোয় আশিসদা যখন পৃথিবীকে বদলাতে চায়, ঝর্নার বুকের ধুকপুকানি তখন দেওয়াল জোড়া ছায়াময় যুবকটিকে একান্ত আপন করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। ভারি রাগ হয় তার, শ্রেণীশত্রু, বুর্জোয়া এসব গুরুপাক শব্দ না বলে আশিসদা যদি কখনও একসাথে তারাখসা দেখার গল্প করত।

“আর মামাবাবু জানতে পারলে?”, আশিসের বুকে মাথা রেখেও স্বরের ব্যাকুলতা লুকোতে পারল না ঝর্না।

“ধুর পাগলি। এই পেল্লাই বাড়ির কোন কোনায় কে ইঁদুর বাদুর লুকিয়ে রেখেছে, সব খবর রাখার কি সময় আছে তাঁর। আর যদি জেনেই যান, তাহলে বলবেন হ্যান্ডস আপ। আর আমিও বই খাতা বগলে নিয়ে সোজা গারদে ঢুকব”, বুকের হাহাকার ঢোঁক গিলে চাপল আশিস। লালবাজার থেকে ওর নামে শুট অ্যাট সাইট হুকুমনামা জারি হয়েছে। ঝর্ণার মামাবাবু জাঁদরেল মন্ত্রী। পূর্ব-পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা বোন আর ভাগ্নি কে ঠাই দিয়েছেন এখানে। তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি স্বরূপ এদের পুনরায় গৃহহীন না করেন। বড় ভুল হয়ে গেছে আশিসের, স্বার্থপরের মতন এই নিষ্পাপ মেয়েটিকে  বিপদে ফেলেছে সে আশ্রয় চেয়ে। আগামীকাল কাকভোরেই সে রওনা দেবে এখান থেকে। পুলিশের টিকটিকি গুলোর ওই সময় চোখ লেগে আসে।

“এই দেখো চেয়ারম্যান কি বলছে”, ঝর্না কে পাশে সরিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসল আশিস। সামনের টেবিলে বই খাতা ছড়ানো। শ্রেণীসংগ্রাম নিয়ে নোট লিখছিল সে আধো অন্ধকারে। বন্দুকের নলে বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইদানিং। ঝর্ণাকে পার্টির বক্তব্য বোঝাতে গিয়ে আজ নিজেই সে সন্দিহান। সাধারণ মেয়ের সাদামাঠা পাল্টা প্রশ্নগুলো আশিসকে দ্বন্দে ফেলে দিয়েছে। ইস্তাহার ঘেঁটে হয়রান হয়ে গিয়েও অকারণ খুনোখুনির যথার্থতা খুঁজে পায়নি সে।

“আমার কি হবে আশিসদা?”, কাঁধ ঘেঁসে দাঁড়ানো ঝর্ণার জিজ্ঞাসায় থামল আশিস। একি সর্বনাশ করেছে সে মেয়েটার? হাতের কলম ফেলে অসহায়ের মতন ও তাকাল তার দিকে। দৃষ্টি সংযোগে মাথা নামিয়ে নিল ঝর্না। আগুন পথের সন্ন্যাসীকে বাহুডোরে বেঁধে রাখার ক্ষমতা তার নেই। আশিসদার লড়াই বৃহত্তরের মঙ্গলের স্বার্থে, সেখানে এক যৎসামান্য, অবুঝ তরুণীর কিই বা ভূমিকা থাকতে পারে।

“তক্তপোষে রুটি রেখেছি, খেয়ে নিও। হরুদাদা পরে থালা নিয়ে যাবে”, মৃদু হাসিতে আশিস কে আস্বস্ত করে, তার পায়ের ধুলো নিয়ে ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল সে।

“মামাবাবু, ওর যেন কোন ক্ষতি না হয়”, ধুমায়িত চায়ের পেয়ালার পাশে বদ্ধ ঘরের চাবি রেখে অশ্রুসিক্ত নয়নে নিজের ঘরে ঢুকে কপাট দিল ঝর্না।


নয় থাকলে আরো কিছুক্ষণ


 ‘মনে আছে? আমার ছুটি শেষ হওয়ার আগের দিন তুমি দেখা করার জেদ করতে? দশ মিনিটের জন্যে হলেও’, বালিশে মাথা সামান্য কাত করে স্ত্রীকে বললেন অয়নবাবু।

‘থাকবেনা আবার। দেখা হলে, কিছুতেই বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করত না আমার। খালি ভাবতাম আর কিছু সময় কাটাই দুজন মিলে। তোমার কিসের যে এত তাড়া থাকত বাপু, আমি এখনও বুঝিনি’, অয়নবাবুর        হাত নিজের হাতে নিয়ে জবাব দিলেন সুজাতাদেবী।

‘তাড়া নয়গো, ভয়…‘

‘কিসের ভয় ছিল তোমার? ভাবতে আটকে রাখব? সে ক্ষমতা কি ছিল আমার?’

‘যাওয়ার সময় তুমি যে হাত টেনে ধরতে। চোখ ভরা জল নিয়ে জানতে চাইতে, আবার কবে দেখা হবে। ভয় পেতাম সেই ক্ষণটাকে। পিছুটানে বড় কষ্ট। পালাতে চাইতাম তাই’,

‘পালাতে তো এখনও চাইছ’,সুজাতাদেবী মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। দু’ফোঁটা অভিমানের জল গড়িয়ে পড়ল গালে।

ওরা দুজনেই একে ওপরের সাথে কোনো কথা বললেন না বেশ কয়েকটা মুহূর্ত। টেবিলে রাখা ঘড়িতে সেকেন্ডের কাটাটি শুধু নিজের মতন ‘টিক টিক’ শব্দে কাজ করে চলেছে। সে কারোর ভালোবাসার বা আবেগের তোয়াক্কা না করে নির্লিপ্ত ভাবে সময়ের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে।

‘ওটা আমাদের…’, টেবিলের তাকিয়ে অয়নবাবু বলার চেষ্টা করলেন। ঘড়িটার দিকে তাকালেই মন কেমন করছে তাঁর আজ।

‘হ্যাঁ, দাদা  দিয়েছিল’, সুজাতাদেবী না তাকিয়েই উত্তর দিলেন। বিয়েতে পাওয়া উপহারগুলোর মধ্যে এইটাই টিকে গেছে এতদিন।   

‘বাকিরা বাইরে গেল?’, অয়নবাবু ঘাড় উঁচু করে খালি ঘরে চোখ বুলিয়ে বল্‌লেন।

‘সব তোমার নাতনীর মাথা থেকে বেরিয়েছে। দাদু ঠাকুমাকে নাকি একা থাকতে দেবে। কি’রকম আদিখ্যেতা বল দেখি’, সুজাতাদেবী চোখ মুছে অনুযোগ করলেন।


মৃদু হাসলেন অয়নবাবু। ভাঙ্গলেন না সুজাতার কাছে, পরিকল্পনায় তাঁরও হাত ছিল।

‘তাহলে এখানেই ইতি গজগামিনী’, অয়নবাবুর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। কাশি চেপে বললেন, ‘তোমার গান কানে নিয়ে যাব ভেবেছিলাম। শোনাবে? ভয় হয়, পুরোটা শোনার সময় যদি না থাকে হাতে।’

‘কোনো ব্যাপার নয়। বাকি রয়ে যায় যদি, তোমার কাছে গিয়েই শোনাব নাহয় কদিন পরে’।

ঘড়িটা টেবিলে উপুড় করে রেখে কাঁপা গলায় অয়নের ভালবাসার গানে সুর দিলেন সুজাতাদেবী। প্রিয় বন্ধুর শেষযাত্রার সময় এবারে আর পিছুটান বাড়াবেন না।।

একলা জ্বলো রে


 ফিস কবিরাজির টুকরো চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চিবানোর পর বিশ্ব হঠাৎ করে টেবিলে এক ঘুষি মেরে বলে উঠল, ‘অবনক্সিয়াস ইডিয়টস! রাসকেল গুলোর সাহস হয় কি করে, স্টুডেন্টদের ইগ্‌নোর করার?’

টেবিলের ঝাঁকুনিতে চলকে পড়া কফির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সাম্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। বিশ্ব যখন বলেছে তখন নিশ্চয়ই সত্যি হবে। ও এই সব ব্যাপার অনেক বোঝে। কয়েকমাস পরেই কলেজ ইউনিয়নের ইলেকশন। বিশ্ব দাঁড়িয়েছে ইলেকশনে। ওর চেহারার চাকচিক্য আর জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়ার ক্ষমতা ওকে ওর প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে এগিয়ে রেখেছে বহুদূর। বিশ্ব খুবই জনপ্রিয় ছাত্র। মেয়েরা ওর সান্নিধ্যে আসার জন্যে পাগল। মাঝেমধ্যে খুব ঈর্ষা হয় সাম্যর। ছেলেবেলা থেকেই হয়। বিশ্বর এই এক্সট্রা কারিকুলার গুণাবলীর কণামাত্র যদি সে পেত, তাহলে জীবনটা ধন্য হয়ে যেত। চিরকাল সাম্য পাঠ্য বইয়ের পাতাতেই মুখ গুঁজে বড় হয়েছে। স্টেজে ওঠার কথা শুনলে এখনও পা কাঁপে। সেখানে বিশ্ব অবলীলায় গিটার অথবা হারমোনিকা নিয়ে হয়ে যেতে পারে সকলের মধ্যমণি। মাথার ঝাঁকড়া চুল নাড়িয়ে, সুরের ঝঙ্কারে মাতিয়ে তুলতে পারে সবাইকে। ভিড়ের মাঝে, এককোণে দাঁড়িয়ে তার এই অসামান্য ক্ষমতার প্রশংসা করা ছাড়া আর কিই বা করতে পারে সাম্য। কতদিন মনের কল্পনায় নিজেকে দেখেছে সাম্য, হাজার-হাজার ছাত্রছাত্রী দের নেতৃত্ব দিয়ে মিছিল নিয়ে যেতে কলেজ ষ্ট্রীট ধরে, যেমন বিশ্ব পারে। হাজার উদ্বাহু প্রাণকে সে অনায়াসে সঞ্চালন করছে জাদুকরের মতন, বিশ্ব যেভাবে করে। দিবাস্বপ্নেই আতঙ্কে ঘেমে উঠেছে সাম্য। ওর ছাপোষা মেরুদণ্ড সেখানেও এতোটা জোর নিতে পারে না।

‘কাল দুপুর থেকেই ইউনিয়ন স্ট্রাইকে যাচ্ছে। প্রফেসর পি.কে.এমের ক্লাসের পরেই তোরা সবাই বেরিয়ে দু’নম্বর গেটের সামনে জমায়েত হবি। সেখান থেকে প্রসেশন করে আমরা প্রিন্সিপ্যালের কাছে যাব। আমাদের দাবী না মানলে পরশু থেকে সব ক্লাস বয়কট’, বিশ্ব একটা টিসু পেপারের ওপরে পেন দিয়ে আঁকিবুঁকি কেটে ওর ছাত্র আন্দলনের পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিল সাম্য সহ উপস্থিত আরও তিন-চার জন কে। বাকিরাও সবাই লিডার গোছের, লড়াকু মনভাব আছে তাদের। একমাত্র সাম্যই এখানে বেমানান। বিশ্ব ওর ছোটবেলার বন্ধু, সাম্যকে বলতে গেলে জোর করেই নিয়ে এসেছে আজ কফি হাউসের আড্ডাতে।

কিন্তু নিজের অস্বস্তি গোপন রাখতে পারলো না সাম্য এইবার। নিজেকে গুটিয়ে রাখার অনেক চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে বেফাস বলেই ফেলল, ‘আবার স্ট্রাইক? গত মাসেই তো কতগুলো ক্লাস মিস হল। পরশু থেকে কিছু মেকআপ সেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল’।

‘ডোন্ট বি সাচ আ কাওয়ার্‌ড সাম্য! এ’রম মেকআপ ক্লাস আসবে যাবে। এর কথা ভেবে যদি আমরা আজকে অন্যায় মেনে নি, তাহলে আর কোনোদিন মাথা তোলার রাইট থাকবে না আমাদের’, বন্ধুকে কোন ছাড় দিল না বিশ্ব, কথা শোনাতে। এই ভীতু মানসিকতার ছেলেমেয়ে দের জন্যেই পৃথিবীতে ছাত্র বিক্ষোভ বারবার অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে গেছে।

‘নেক্সট উইক আমরা কোথায় আমেরিকান সেন্টারের সামনে ধর্না দেওয়ার প্ল্যান করছি আর তুই তোর ক্লাস নিয়ে পড়ে আছিস বোকা কোথাকার!’

সমষ্টির হই-হই এর মাঝে নিজেকে আরও গুটিয়ে নিল সাম্য। বিশ্বর বাবা এক নামকরা মিডিয়া হাউসের চেয়ারম্যান। চোস্ত ইংরাজি বলা বিশ্ব, কলেজ শেষ করে বিপ্লব-বিপ্লব খেলবে হয়ত আরও কিছুদিন। তারপরে একঘেয়ে লাগলে বাবার ব্যবসায় হাত লাগাবে। কাপুরুষ সাম্যটাই শুধু ক্লাস মিস করা গ্লানিতে জুতোর সুকতলা ছিঁড়বে।

‘নন্দনে যাবি? ওখানে বোহেমিয়ান মিউজিক ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে’, বন্ধুকে কড়া কথা শোনানোর জন্যে বিশ্ব একটু অনুতপ্ত হয়ে প্রস্তাব দিল।

‘নাহ আমার টিউশন করাতে যেতে হবে।’

‘পরমা আসবে বলেছে। তাও যাবি না? পাগলে গেলি নাকি?’   

‘নাহ্‌ রে স্টুডেন্ট টার সামনেই পরীক্ষা। একটু দেখিয়ে না দিলে বিপদে পড়বে। তুই এগো ভাই, আরেকদিন হবে।’

বই পাড়া ধরে হাঁটতে-হাঁটতে নিজেকে খুব নগণ্য মনে হচ্ছিল সাম্যর। অনেকটা বইয়ের স্তুপে হারিয়ে যাওয়া পুরনো ম্যাগাজিনের মতন, যার খবর কেউ রাখে না। যে হারিয়ে গেলে কারোর কিছু যায় আসে না। বই এর বান্ডিল গুলোর মতনই যূথবদ্ধ একদল অতি সাধারণ মানুষের একজন সে। রিভলিউশন, গিটার, সামাজিক পরিবর্তন, আন্দোলন এইসব হৃদয় দোলানো, রক্ত টগবগিয়ে তোলা জিনিস ছেড়ে রেখে, বাবার পেনশন আর বোনের স্কুলের মাইনের মতন গতানুগতিক বিষয় নিয়ে তাকে দিন কাটাতে হয়। রাস্তার পাশের ডাস্টবিন টাকে নিজেকে কল্পনা করে একদলা থুতু ছিটিয়ে বাসে উঠে পড়ল সাম্য।

বাসের জানালা দিয়ে ধোঁয়াশায় ঘেরা চলমান জনতা কে নিজের মনে করুণা করছিল সাম্য। কি ক্ষুদ্র, কি সামান্যই না ওদের জীবনের লক্ষ্য। নিত্যনৈমিত্তিক ভাত-রুটির খোঁজে ব্যস্ত থাকা লোক গুলো জানতেই পারেনা গোটা দুনিয়ায় কি আলোড়ন হচ্ছে। প্যারিসে হলুদ শার্টরা ব্যারিকেড ভেঙ্গে সমতার গান গাইছে। আফ্রিকার গরীব গুলো এখনও না খেতে পেয়ে মরছে। মেরুর বরফ গলে কদিনের মধ্যেই সব ফর্সা হয়ে যাবে। জাপানে মাছ খেয়ে লোকেরা একশ বছর বাঁচছে। ‘খ্যাক থুঃ’, কিস্‌সু জানে না এরা। খালি ট্যাক্স বাঁচানোর ফন্দি ফিকির খুঁজে বেড়ায় আর জীবনভর গাধার মতন এলআইসি প্রিমিয়াম ভরতে থাকে।

একটা চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে বাসের পিছনের দিকে তাকাল সাম্য। দেখল তিন চারটে পাকানো চেহারার  ছেলে একজোট হয়ে কুৎসিত ভাষায় ঠাট্টা পরিহাস করছে। ওদের লক্ষ্য সামনে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা এক যুবতী। ছেলেগুলোর বেপরোয়া, নোংরা, ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা আর লুড দৃষ্টি অসহায় মেয়েটাকে টিকতে দিচ্ছে না নিজের সিটে। বাস ভর্তি লোক, কিন্তু তারা সবাই আজ বিবাগী হয়ে জানালা দিয়ে দূরের কোন দৃশ্যে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে। বাসের ভিতরে ভয়ে ছটফট করতে থাকা মেয়েটাকে কেউ যেন দেখতেই পাচ্ছে না। সবার এই আন্তরিক নীরবতায় বলিষ্ঠ থেকে বলিষ্ঠতর হয়ে উঠল ছেলেগুলো। ওদের একজনের হাত এরপরে ইচ্ছে করেই ছুঁয়ে দিল তার শিকার কে। মেয়েটার ফোঁপানো আর্তনাদ বাসের ইঞ্জিনের ঘর্ঘর শব্দের থেকেও জোরালো হয়ে কানে বিঁধল সাম্যর।

কি করত বিশ্ব, যদি সে এখানে থাকতো? নিশ্চয়ই ঝাঁপিয়ে পড়ে টুঁটি চেপে ধরত ওই দুষ্কৃতি গুলোর। ওর বেয়াম করা পেশীবহুল হাতের এক ধাক্কায় নির্ঘাত নড়ে যেত ওদের ঘিলু। ওর অদম্য সাহসিকতায় অনুপ্রাণিত হয়ে বাকিরাও উঠে প্রতিবাদ করত। কিন্তু বিশ্ব তো কোনদিন বাসেই চড়েনি। ওর লাখ টাকার বাইক প্রতিদিনই হুস করে পাশ কাটিয়ে চলে যায় সাম্যদের ভাঙ্গাচোড়া বাস। আজও সে জানতেই পারবে না তার নেতৃত্বের কতখানি দরকার এখানে, এই মুহূর্তে। ভেনিজুয়েলার লোকেরা নাহয় ওর জন্যে অপেক্ষা করত আরেকটা দিন।


‘কাওয়ার্‌ড’, শব্দটা বার বার কানে বাজতে লাগলো সাম্যর। বিশ্ব শুধু ওটা সাম্যকে বলেনি। শালা এই পুরো জাত টাই কাপুরুষে ভরা। পঞ্চাশটা লোক কেমন মাথা নিচু করে নিরাপদে ঘরে পৌছাতে চাইছে। বাড়ি গিয়ে, ডাল-রুটি খেয়ে, জমিয়ে সারেগামাপা দেখে আবার পরের দিনের লড়াই শুরু করবে এরা। নিজের মাছভাজা, শুক্ত খাওয়া সরু লিকলিকে হাত দুটোর ওপরে ঘেন্না এলেও সাম্যর ভরসা আছে তার কল্‌জের ওপরে। মেয়েটাকে নয়, খোলসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বাকি লোকগুলোকে বিশ্বর ‘কাপুরুষ’ গালির হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে কিছু করা উচিত। এঁদের দরকার পথ-প্রদর্শকের, যে অনেকটা তাদেরই মতন নিরীহ, গোবেচারা।

ব্যাগটাকে শান্ত ভাবে সিটে রেখে উঠে দাঁড়াল সাম্য। কয়েকটা বিস্ফারিত চোখের সামনে দিয়ে দৃপ্ত কিন্তু ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ওদের কাছে। তারপরে বুকের সবটুকু দম একত্রীত করে চিৎকার করে বলল, ‘খবর্দার!’

ছেলেগুলো চমকে দেখল সাম্য একা নেই সেখানে, উঠে দাঁড়িয়েছে আরও অনেক মধ্যবিত্ত।।  

বৈশাখী


 সেন্ট্রাল লন্ডনের সেন্ট জেমস পার্কের গাছে-গাছে নবপল্লবের বাহারে ছিল বসন্তের উঁকিঝুঁকি। গত কদিনের বিশ্রী, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার পরে আজকের মিঠে রোদ সবার মুখে খুশীর উষ্ণতা এনেছে। এটুকুতো ওদের প্রাপ্যই। বিগত এক বছর মহা-যুদ্ধের কালো মেঘ থাবা মেরেছে জিনিসপত্রের উপলভ্যতায়। আকাশছোঁয়া মূল্য নিত্যনৈমিত্তিক সামগ্রীকে নিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার অনেক ওপরে। আপতকালীন অবস্থার নিয়মানুসারে, নারীপুরুষ নির্বিশেষে সকলেই নামমাত্র বেতনে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে রুটির খোঁজে ব্যাকুল। সীমাহীন সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতেও লোকের আহার জুটছে না আজকাল। ‘সত্যি, কি বিচিত্র এই ভাগ্যের খেলা’, কোলের ওপরে খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রেখে স্বগতোক্তি করল লোকটা। পোশাকআশাক পুরদস্তুর সাহেবি হলেও মুখের আদল আর গায়ের মাজা রঙ বলে দিচ্ছে যে সে শ্বেতাঙ্গ নয়। পকেট থেকে ঘড়ি বের করে ইতিমধ্যেই কয়েকবার সময় দেখেছে ও। অবশেষে মুখে অর্থবহ হাসির একটা ঝিলিক এনে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক বিরস বদন প্রবীণকে টুপি তুলে অভিবাদন করে গন্তব্যের দিকে পা চালাল সে।

বাকিংহ্যামের রাজ প্রাসাদের সামনে জায়গায়-জায়গায় জটলা। একটা কিশোর কাঠের বাক্সের ওপর দাঁড়িয়ে সান্ধ্য পত্রিকার খবর ঘোষণা করছে। দুষ্টু বলশেভিকদের সাথে বীর ফিনিশদের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে গতকাল, আগামী সপ্তাহ থেকে দিনে দুবার করে সাইরেন বাজিয়ে বম্ব্‌-শেল্টারে যাওয়ার অভ্যেস শুরু হবে এইসব আরও কত কি মুখরোচক সংবাদ। সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিনছে ট্যাবলয়েডের কপি গুলো। লোকটা সেসব অগ্রাহ্য করে, অলিগলি বেয়ে উপস্থিত হল লন্ডনের ঐতিহাসিক ক্যাক্সটন হলের সামনে। সিঁড়ির ধাপের কাছে কয়েক মুহূর্ত থেমে চোখ বন্ধ করে নিজেকে গুছিয়ে নিল। একুশ বছর ধরে সে রক্তের শপথ বহন করে চলেছে। আজ মাহেন্দ্রক্ষণে পৌঁছে কোনরকম ভীতি বা চঞ্চলতা যেন তাকে টলাতে না পারে। কমিউনিস্ট মতাদর্শের নাস্তিকতা তাকে ‘বাহে গুরু’ বলতে বাধা দিল না। কোটের বোতাম আটকে দৃপ্ত পদক্ষেপে মিশে গেল হলের ভিতরে আলো আঁধারিতে।

ইষ্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন থেকে আয়োজিত হয়েছে আজকের আলোচনা সভা। যেখানে খোদ ইউরোপের মাটিতে যুদ্ধের দামামা বেজেছে, সেখানে সুদূর ভারতবর্ষের গল্প শোনার আগ্রহ অনেকেরই নেই। শ্রোতার উপস্থিতি অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেকটাই কম। তা স্বত্বেও বেশ কিছু বিশিষ্ট অভিজাত অতিথিবর্গের আগমন হয়েছে। এঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দূরপ্রাচ্যের অশিক্ষিত বর্বরদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতার আলোকধ্বজা তুলে ধরার জন্যে এঁরা নানা রকমের রাজকীয় খেতাবও পেয়েছেন। লন্ডনের বুদ্ধিজীবী মহলের সেরার সেরারা আজকে চর্চা করবেন কিভাবে যুদ্ধের পরে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ভারতবর্ষের ওপরে কর্তৃত্ব বজায় রাখা যায়।  খাটো ধুতির ফকির কে নিয়ে যেমন হাসির ফোয়ারা উঠছিল থেকে-থেকে, তেমনই সাদা চামড়াদের রক্ত ফুসে উঠছিল পাঞ্জাব আর বাংলার কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদীদের নামে। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের গর্বে তারা এতটাই মশগুল হয়েছিল যে খেয়ালই করেনি দর্শকাসনে, দ্বিতীয় সারিতে বসা সেই বাদামী আগন্তুককে। নিস্পলকে সে পর্যবেক্ষণ করছিল স্টেজের রাশভারী লর্ড আর ব্যারন দের মধ্যমণিকে। বেখেয়ালে কখন হারিয়ে গেছিল স্মৃতির অতলে, একুশ বছর আগের দিনটায়।

বৈশাখীর মেলায় এন্তার লোক এসেছিল। বাচ্চা থেকে বুড়ো, সকলেই হরমন্দির সাহিবে প্রার্থনা আর সরোবরে পুণ্য স্নান সেরে ঘরে ফেরার পথে উঁকি মারতে এসেছিল মাঠের জমায়েতে। গত কয়েকদিনের নিরন্তর হিংসাত্মক ঘটনা প্রবাহের পর সেদিন অমৃতসর ছিল শান্ত। সবাই একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে বৈশাখীর শুভেচ্ছার আদান প্রদান করছিল। বাচ্চারা ছুটে বেড়াচ্ছিল এদিক সেদিক। মায়েরা, দাদিরা যত্রতত্র শতরঞ্চি বিছিয়ে সাংসারিক গল্পগাছায় ছিল ডুবে। সেই লোকারণ্যে ছিল বছর কুড়ির এক তরতাজা তরুণও। আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর সাথে সে মাটির সরাতে জল দিচ্ছিল তেতেপুড়ে আসা মানুষদের। মাঠের মাঝখানে দু তিনটে কাঠের বেঞ্চি পেতে তার ওপরে দাঁড়িয়ে দু তিনজন সত্যাগ্রহী হাতে চোঙ্গা নিয়ে ‘রাউলাট নিপাত যাও’ চিৎকার করছিল। কেউ-কেউ দাঁড়িয়ে শুনছিল তাদের কথা, আবার অনেকেই তাদের নিজেদের সন্তানাদির দৌরাত্ম্যেই ব্যতিব্যস্ত ছিল। কানাঘুষোয় খবর আসছিল কার্‌ফিউর, কিন্তু আনন্দের দিনে সামান্য একটু মুক্তির স্বাদ নিতে পেরে সবাই সবকিছু ভুলে থাকছিল। একটা ছোট্ট ছেলেকে জল দিতে গিয়ে সেই তরুণ লক্ষ্য করেছিল হাঁটু গেঁড়ে, বন্দুক তাক করে বসা সেপাইদের। অতো কোলাহলের মাঝেও শ্বেতাঙ্গ অফিসারটির শ্লেষাত্মক, তীব্র ‘ফায়ার’ আদেশ কানের পর্দায় অনুরণিত হয়েছিল তার। কিছু বোঝার আগেই চোখের সামনে পিপাসার্‌ত ছেলেটির বুক চিড়ে ছুটে গেছিল বুলেট। সেই অবাক হাঁ করা মুখে জলের ফোঁটা দেওয়ার সুযোগও পায়নি তরুণটি। কাঁধে গুলি খেয়ে অন্ধকার নেমে এসেছিল তার দুই চোখে।


আপনাদের সামনে এবারে বক্তব্য রাখবেন সম্মানীয় মাইকেল ও’ডায়ার, পাঞ্জাবের গভর্নর ছিলেন ইনি। বদমাশ নেটিভ দের শায়েস্তা কি করে করতে হয় তা এনার কাছ থেকে শেখা উচিত’, বক্তা আহ্বান করলেন প্রধান অতিথিকে কিছু বলার জন্যে।

গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু বলার সময় বক্তার চোখ আটকে গেল সেই বাদামী শ্রোতার দিকে। জহুরীর চোখ, সহজেই রঙের পার্থক্য করা শিখেছেন দীর্ঘদিনের অভ্যাসে।

এই ভারতীয় এখানে কি করছে?’

স্মিত হেসে উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে পিস্তল তাক করলো সেদিনের সেই তরুণ। একুশ বছরের অপেক্ষার শেষে মাতৃভূমির রক্তের ঋণ শোধ করবে আজকে রাম মহম্মদ সিং আজাদ ওরফে বিপ্লবী উধম সিং,

ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।।